আব্বা চলে গেছেন,রেখে গেছেন মাদরাসা পড়ুয়া ২৬ জনের একটি উলামা বাগান

Abba-Namaj3.jpg

মো. আব্দুল মান্নান:
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার পূর্ব নড়াইল গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক আমার আব্বা মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার (১০৫) জবর আলী। তিনি চলতি ২০২০ সনের ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটের সময় নিজ বাড়িতে ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। আব্বার বাবা ছিলেন কৃষক মরহুম কেরামত আলী আর তাঁর মা অর্থাৎ আমার দাদীর নাম ছিল মরহুমা গোলাপজান বিবি। আব্বার সহোদর কোন ভাই ছিল না। একজন বোন ছিলেন তিনি ছোটবেলায় বিয়ের আগেই ইন্তিকাল করেন। অবশেষে আব্বাও চলে গেছেন, রেখে গেছেন ছেলে, মেয়ে ও নাতিপুতির মধ্য থেকে ২৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি উলামা বাগান। এর বাইরেও আব্বার সন্তানাদি ও নাতিপুতি রয়েছেন। আব্বা দুনিয়াবি বিশাল কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। তবে সবাই বলে, জবর আলী একটা উলামা বাগান রাইখ্যা গেছে। নড়াইল গ্রামে তার চেয়ে বেশি ধনী থাকতে পারে কিন্তু তার মত এত আলেম কেউ পয়দা করে যেতে পারেনি। ২৬ জন আলেম উলামা বা মাদরাসা পড়ুয়া তালিবে ইলম রয়েছেন তার বাড়িতে। যার মূল আমার আব্বা। আব্বা একজন আদর্শ কৃষক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, ন¤্র ও ভদ্রলোক ছিলেন। আব্বার কোন ঋণ নেই। আব্বা মিথ্যা কথা বলতেন না। পরের ক্ষতি করতেন না। সুদ খাননি ও দেননি। পারলে মানুষের উপকার করেছেন; ক্ষতি করেননি। আমাদের আশপাশের দুয়েকজন লেখাপড়া করে সুনাম করতে পারেনি বলে, চাকরি পায়নি বলে প্রথম জীবনে আব্বা আমাদেরকে লেখাপড়ায় নিরুৎসাহিত করতেন। কুরআন শরীফ পড়ার পর তিনি আমাকে বলেছিলেন, থাক বাবা, আর ফড়ন লাগদো না। কুরআন শরীফডা ফরছছ। অহন নামাজ টামাজডা ফরতারবে। অত ফইড়া লাভ নাই। চাকরি বাকরি পাইতে না। কাম কইরাই খাওন লাগবো। হুদাই সময় নষ্ট কইরা লাভ কি? দেহস না অমুকরা লেহাফড়া কইরা বইয়া রইছে। চারহি ফায় না। পরবর্তীতে জানতে পারি ওদের সব থার্ড ডিভিশান ছিল। ওরা ছাত্র হিসেবে অতটা ভাল ছিল না। মূলকথা হলো, আব্বার কথায়ও থেমে যাইনি। কিছুদিন যেতে না যেতেই আমাদের প্রশংসা শুনে আব্বার ধারণা পাল্টে যায় এবং আমাদের প্রতি তিনি মুগ্ধ ছিলেন, খুশি ছিলেন। আব্বার প্রিয় বড় বড় গাছ ও পুকুরের মাছ বিক্রি করে আমাদের লেখাপড়ার খরচ যুগিয়ে গেছেন তিনি। তিনি হালাল জীবিকা উপার্জন করে খেতেন এবং আমাদের খাওয়াতেন। আব্বার গোয়ালভরা গরু মহিষ ছিল। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি সম্পদ জুড়িয়েছিলেন। অনেক অসুখ বিসুখ গেলেও আব্বা কখনো জমি বিক্রি করতে রাজি হননি। আমাদের সুখের জন্যে সবসময় তিনি ভাবতেন। সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আব্বার ঘরে নেই কোন হাইফাই খাট-পালং বা কোন ফার্নিচার। কষ্ট করলেও করেননি কোন ধার কর্জা বা ঋণ। এসব কারণে দোকানে পাটে গেলে আব্বাকে সবাই সমীহ করতো। আব্বার এলাকায় প্রথম মাওলানা ও প্রথম হাফেজ যে হয়েছে সে আর কেউ নয় আব্বারই ছেলে। আব্বার ছেলেদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে আলহামদু লিল্লাহ আরো অনেকেই এলাকায় হাফেজ আলেম হয়েছেন এবং হচ্ছেন।
সংক্ষেপে পরিচয় দিচ্ছি: আমার আব্বার ১ম ছেলে: মো. হাসান আলী কৃষক। তিনি ছোটবেলা থেকেই নামাজ পড়েন, তাবলীগ করেন। সবাই তাকে মুনসি বলে ডাকে। হাসান আলীর ১ম ছেলে: তাফাজ্জল হোসেন কৃষক। তফাজ্জল হোসেনের ছেলে মারুফ হাসান নূরানী পড়ে। হাসান আলীর ২য় ছেলে: হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান শিক্ষক। নাজমুল হাসানের ছেলে সাদ নূরানী পড়ে। হাসান আলীর ৩য় ছেলে: মাওলানা শাহাদাত হুসাইন শিক্ষক। হাসান আলীর ৪র্থ ছেলে: হাফেজ মাওলানা সাজ্জাদুর রহমান শিক্ষক। সাজ্জাদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আল কুরআনে অনার্স-মাস্টার্স। ৫ম ছেলে: হাফেজ মুশাররফ হুসাইন ফাযিলে অধ্যয়ণরত।
আব্বার ২য় ছেলে: মরহুম ইউনুস আলী কৃষক। তিনি আমাদের সমাজের নেতা ও সমাজসেবক ছিলেন। মানুষের দুর্দিনে পাশে থাকতেন। মানুষের একটু উপকার করতে ঝাঁপিয়ে পরতেন। ইউনুস আলীর ১ম কন্যা: ফরিদা পারভীন বিবাহিতা গৃহিণী। পারভীনের প্রথম ছেলে হাফেজ জাহিদুল ইসলাম পারভেজ কিতাবখানায় অধ্যয়ণরত। দ্বিতীয় ছেলে ফাহিম নাজেরা পড়ে। ইউনুস আলীর ছেলে হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হক শিক্ষক। তার ছোট কন্যা: শারমীন আখতার বিবাহিতা গৃহিণী। শারমীনের ছেলে সাকিব নাজেরা পড়ে আর মেয়ে মুবাশ্বিরা মহিলা মাদরাসায় নূরানী পড়ে। আব্বার ৩য় ছেলে: মরহুম হামেদ আলী। তিনি বাল্যকালে মারা গেছেন। ৪র্থ ছেলে: মুহাম্মদ আলী কৃষক। মুহাম্মদ আলীর ১ম ছেলে: মরহুম আবু রায়হান। সে ছাত্রাবস্থায় মারা গেছে। ২য় ছেলে: আবু হানিফ চাকরিরত। একটিই কন্যা: মাহমূদা সদ্য বিবাহিতা গৃহিণী। মুহাম্মদ আলীর ৩য় ছেলে: নোমান ছাত্র।
আব্বার ৫ম ছেলে: আবুল কালাম কৃষক। আবুল কালামের ১ম ছেলে: নাসির জন্মের পরই মারা গেছে। ২য় ছেলে: হাফেজ নাঈম বিন কালাম শিক্ষক। সে কম্পিউটারে ডিপ্লোমা করেছে। আবুল কালামের ১ম কন্যা: মুনিরা বিবাহিতা গৃহিণী। ২য় কন্যা: সুরাইয়া মুন ছাত্রী ও ৩য় কন্যা: সাদিয়া ছাত্রী।
আব্বার ৬ষ্ঠ ছেলে: আমি নিজে মো. আব্দুল মান্নান। ছারছীনা আলিয়া মাদরাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে কামিল হাদীস পাস করেছি। এর আগে নড়াইল দাখিল মাদরাসায়, দক্ষিণ খয়রাকুড়ি ও নালিতাবাড়ি তারাগঞ্জ সিনিয়র মাদরাসায় পড়েছি। কিসমত নড়াইল ক্বেরাতিয়া মাদরাসা থেকে ক্বেরাতে প্রথম বিভাগ পেয়ে ক্বারী জাকারিয়া রহ: -এর নিকট থেকে সনদপ্রাপ্ত ও ঢাকা যাত্রাবাড়ির জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া মাদরাসা থেকে নূরানী প্রশিক্ষণে প্রথম বিভাগ অর্জন করেছি। এছাড়া ঢাকা ধানমন্ডি লেক সার্কাস থেকে ইংলিশ মিডিয়ামের টিচার আদিল খানের অধীনে ইংলিশ প্রোনানসিয়েশন, একসেন্ট অ্যান্ড গ্রামার বিষয়ে এক বছর ট্রেনিং নিয়েছি। বর্তমানে ফুলপুরে থাকি। ফুলপুর সরকারি কলেজ রোডস্থ দারুল ইহসান কাসিমিয়া (এক্সিলেন্ট) মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। এর আগে বরিশাল চরমোনাই ইউনিয়নে শালুকা দাখিল মাদরাসার এ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার পদে থেকে প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। যাত্রাবাড়ি মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা মাহমুদুল হাসান দামাত বারাকাতুহুমের মাদরাসায় জেনারেল শিক্ষক ছিলাম। তখন কাজলায় ড. আবুল কাশেম পরিচালিত ইবতিদায়ী মাদরাসায় ও দোলাইরপাড় মহানগর স্টীল কর্পোরেশনের মালিক আলহাজ্ব জাকির হোসেন পরিচালিত দারুর রহমান মাদরাসায় পার্টটাইম শিক্ষকতা করেছি। ইমাম হিসেবে বিশ্ব ইজতিমা সংলগ্ন টঙ্গী ভাদাম জামে মসজিদে, ছারছীনা মাদরাসা সংলগ্ন হাজী আব্দুর রহমান জামে মসজিদে, আকলম কাজী বাড়ি জামে মসজিদ, চরমোনাইয়ে ডিঙ্গা মানিক জামে মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে দিউ বায়তুস সালাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব পালন করছি। এগুলো আব্বার অর্জন। শুকরিয়াস্বরূপ বলছি, ছোটবেলায় রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় পিছন থেকে লোকেরা আমাকে বলতে শুনেছি ‘গোবরে পদ্মফুল’। হালুয়াঘাটে নড়াইল উলামা ঐক্য পরিষদের সভাপতি বানানো হয়েছে আমাকে। এছাড়া লেখালেখির সাথেও জড়িত আছি। আমি দৈনিক তথ্যধারা, বাংলাদেশের খবর ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফুলপুর প্রতিনিধি ও দি এশিয়ান এইজের হালুয়াঘাট প্রতিনিধি। ‘দৈনিক ময়মনসিংহ’ নামে আমার একটি অনলাইন পোর্টাল রয়েছে। আশির দশকে জুয়ামেলা ও সিডির মাধ্যমে টিভিতে ব্লু ফিল্ম প্রদর্শন বিরোধী আন্দোলনে এলাকায় নেতৃত্ব দিয়েছি ও সফল হয়েছি। বাহেসের মাধ্যমে অষ্টগ্রামের ভন্ড পীরকে পরাজিত করে এলাকা ছাড়া করেছি। এলাকাকে বিদআতমুক্ত করতে এখনো আপোসহীন ভূমিকায় রয়েছি। আমার স্ত্রী হাসিনা বেগম একজন শিক্ষিকা। সে আমার কাজকে এগিয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পরিবারের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে তাদের খোঁজ খবর নেওয়া ও তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে অবিরত কাজ করে চলেছে সে। তার বিবাহের পর আমরা সবাই মিলে আব্বা-আম্মার যে সেবাটুকু করেছি আমার মনে হয় এর অর্ধেক সে একাই করেছে। তার প্রতি শুধু আমি না আব্বা-আম্মাসহ পরিবারের সবাই খুশি। আমার শ্বাশুড়িও তাকে সেভাবে মোটিভেট করে থাকেন। আমার ১ম কন্যা: মাশহুরা মীম। ফুলপুর মহিলা কামিল মাদরাসায় ফাযিলে ও শেরপুর সরকারি কলেজে গণিত বিষয়ে অধ্যয়ণরত। ২য় কন্যা: মাশকূরা। বিশ পারার হাফেজ। ফুলপুর মহিলা কামিল মাদরাসায় আলিমে অধ্যয়ণরত। আমার ১ম ছেলে: মুস্তাকীম আল মান্নান। ঢাকায় ময়নারটেকে দারুল কুরআন ইসলামিয়া মাদরাসায় হিফজুল কুরআন বিভাগে ২০ পারায় অধ্যয়ণরত। ২য় ছেলে: ইহসানুল মান্নান। সে দারুল ইহসান কাসিমিয়া এক্সিলেন্ট মাদরাসায় হিফজ বিভাগে ৩য় পারায় অধ্যয়ণরত। আমার সর্বকনিষ্ঠ কন্যা: মাসতূরা দারুল ইহসান কাসিমিয়া এক্সিলেন্ট মাদরাসায় নূরানী বিভাগে অধ্যয়ণরত।
আব্বার ৭ম ছেলে: মাওলানা আব্দুল হান্নান শিক্ষক। সে দারুল উলূম হাটহাজারী থেকে দাওরা পাস। এর আগে সে মাঝিয়াইলে, ভাট্টায় ও মেখল মাদরাসায় পড়েছে। তার ছেলে হুজাইফা নূরানী পড়ে। ৭ম ছেলের পর আব্বার ১ম কন্যা নাসিমা বিবাহিত। নাসিমার ১ম কন্যা আসমা বিবাহিত। ২য় কন্যা তানিয়া ছাত্রী। ৩য় কন্যা তামান্না ছাত্রী ও ৪র্থ কন্যা জান্নাত ছাত্রী। ছেলে নাহিদ নূরানী পড়ে।
আব্বার ২য় কন্যা মরহুমা মারইয়াম বিবাহিত। মারইয়ামের প্রথম ছেলে হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন শিক্ষক। সে ফাযিলে অধ্যয়ণরত। ২য় ছেলে নাজেরা পড়ে। আব্বার ৮ম ছেলে: এমফিল গবেষক হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ। সে জামিয়া রহমানিয়া থেকে দাওরা পাস করেছে। আমুয়াকান্দা মাদরাসায় হিফজ শেষ করে ঢাকা যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় শুনিয়েছে। এরপর সে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে ও আমার ক্লাসমেট কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীর তত্বাবধানে ‘সমাজসেবায় ইমামগণের ভূমিকা’ বিষয়ে এমফিল গবেষণা সম্পন্ন করে । সে বর্তমানে কুষ্টিয়া নিউ টাউন জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব। প্রভাষক পদে নিবন্ধন করেছে। আব্বার সবশেষ সন্তান ৩য় কন্যা: রাশিদা খাতুন বিবাহিতা গৃহিণী। তার ১ম ছেলে জাওয়্যাদ নাজেরা পড়ে ও ২য় ছেলে জায়্যিদ নূরানী পড়ে। এই হলো আব্বার তত্বাবধানে গড়ে উঠা উলামা বাগান। এই উলামা বাগানে নূরানী, নাজেরা ও হিফজ পড়ুয়া আছে। এছাড়া হাফেজ, মাওলানা, এমফিল গবেষণা কমপ্লিট করে ফেলেছেন এমনও রয়েছেন। একই বাড়িতে এতগুলো হাফেজ, মাওলানা আমার জানামতে নড়াইল ইউনিয়নে আর কারো বাড়িতে নেই। আব্বার নেতৃত্বাধীন এই বাগানের অন্যতম মালী ছিলেন আমার আম্মা হাসান বানু। তাঁদের সার্বিক পরিচর্যায় গড়ে উঠা এ বাগানের প্রথম কুঁড়ি আমি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের কবুল করেন। এ বাগান থেকে যে ফসল উৎপন্ন হবে তা যেন আব্বা-আম্মা পান এবং আমরা যেন মরণ পর্যন্ত আব্বা আম্মার সম্মান অক্ষুন্ন রেখে সুন্নাত মোতাবেক জীবন যাপন করতে পারি সেই লক্ষ্যে সকলের দোয়া, বুদ্ধি পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।

Share this post

PinIt
scroll to top