সম্মানিত ওয়ায়েজদের প্রতি খোলা চিঠি

Mukhles745.jpg

মুখলেসুর রহমান:
ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে বড্ড বেকায়দায় পড়ে গেছেন সেসব ওয়ায়েজ এবং রাজনীতিবিদ যারা জোশের ঠেলায় হুশ রাখতে না পেরে বেহুদা ও বেফাঁস কথা বলে ফেলেন অবলিলায়।
এসব ওয়ায়েজ এবং রাজনীতিবিদ যখন মঞ্চে উঠে কথা বলতে থাকেন তখন তারা বেমালুম ভুলে যান যে, বহু ক্যামেরা সযত্নে ধারণ করছেন তাদের ওয়াজ বা বক্তৃতা।
সাধারণ মানুষকে বোকা ভেবে নিজের জ্ঞানের বিশালতা প্রকাশ করতে যেয়ে যেসব আজগুবি, বেফাঁস, ভিত্তিহীন ও নির্জলা মিথ্যার আশ্রয় নেন এ শ্রেণীর ওয়ায়েজ এবং রাজনীতিবিদ তখনই বেরসিক দুষ্টু ছেলেরা তাদের ওয়াজ বা বক্তৃতার চুম্বকাংশ দিয়ে তৈরী করে ফেলেন ভিডিও ক্লীপ। ছড়িয়ে দেন ইউটিউব, ফেসবুক সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ক্ষিপ্ত হন ওয়ায়েজ এবং রাজনীতিবিদ।
তখন তারা ইনিয়েবিনিয়ে বলার চেষ্টা করেন, ওয়াজ বা বক্তৃতা কাটছাঁট করে খন্ডিত অংশ প্রকাশ করে তাদের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে।

কখনো সখনো নিজের ওয়াজ বা বক্তৃতার হাস্যকর এবং আজগুবি অংশকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য ভিডিও ক্লীপ প্রস্তুতকারীর নেতিবাচক দিক তুলে আনার চেষ্টা করে থাকেন।

তবে এরা কেউ বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার সাহস কখনোই দেখান না এজন্য যে গোটা বক্তব্যই বহু ক্যামেরায় বিভিন্ন কায়দায় এমন ভাবে ধারণ করা হয় যে, কোন কিছু অস্বীকার করে পার পাওয়ার সুযোগ বর্তমান জমানায় বেশ কঠিন।
কিছু রাজনীতিবিদ না হয় তাদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে একটু আধটু অসত্য ও বেফাঁস কথা বলে ফেলেন এই চিন্তায়, রাজনীতিতে কোন শেষ কথা নেই।
তাদের ব্যাপারগুলো আমার কাছে ধর্মীয় আলোচক বা ওয়ায়েজদের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু কতিপয় ওয়ায়েজ ধর্মের নামে অসত্য, বিকৃত,হাস্যকর এবং রাসূলের নামে এমন সব কথা কীভাবে চালিয়ে দেন যা রাসূল সাঃ কখনো বলেন নি। এমন সব কিসসা কাহিনী অবলিলায় ধর্মসভায় বলে বেড়ান যা সাধারণ জনগণের জন্য বিনোদনের অংশ হলেও সচেতন, শিক্ষিত মহলে হাসির খোরাক জোগায়। আর ধর্ম বিদ্বেষী নাস্তিক গোষ্ঠীর সমালোচনার রসদ হিসেবে বিবেচিত হয় এসব ওয়াজ।
অতএব, ওয়ায়েজদের প্রতি বিনীত অনুরোধ;
১.
দয়া করে ইসলামের কথা বলতে গিয়ে পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসকে মূল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করুন।
২.
ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কিসসা-কাহিনি পরিহার করুন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কিসসা বর্ণনা করুন।
৩.
ইসলামের উপর লিখিত প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি মূল ভাষায় পড়ার চেষ্টা করুন। মূল ভাষার কিতাব পাওয়া না গেলে গ্রহণযোগ্য অনুদিত বইয়ের সাহায্য নিতে পারেন।
৪.
স্বপ্নকে ইসলামী জ্ঞানের উৎস হিসেবে বিবেচনা করবেন না। কারণ স্বপ্ন কোন অকাট্য দলীল নয়। তা সত্যও হতে পারে আবার অসত্যও হতে পারে।
৫.
নিজের বড়ত্ব জাহির করতে গিয়ে অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা থেকে বিরত থাকুন।
৬.
পোষাক পরিচ্ছদে স্বাভাবিকতা বজায় রাখুন। কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক পোশাক পরিচ্ছদ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
৭.
শব্দচয়ন এবং ভাষা প্রয়োগে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করুন। রুঢ়, অশালীন, কর্কশ এবং অন্যের জন্য কষ্টদায়ক শব্দ ও ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
৮.
অরুচিকর অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করবেন না। এতে আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হতে পারে।
৯.
মাইক থাকা সত্বেও যেখানে সেখানে চিৎকার দেয়া বন্ধ করুন। চোখ লাল করে রেগেমেগে ভয়ানকভাবে হুমকি ধমকি পরিহার করা বাঞ্চনীয়।
১০.
বিনয়ী হোন; ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ পরিহার করুন।
১১.
দীর্ঘ বক্তৃতা পরিহার করুন, মানুষ বিরক্ত হওয়ার পূর্বেই আলোচনা শেষ করুন।
১২.
গভীর রাত পর্যন্ত ইসলামী আলোচনা করবেননা। এটা একদিকে রাসূলের সা সুন্নাহর পরিপন্থী অপরদিকে এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে। অনেকের ফজরের নামাজও ক্বাজা হয়ে যায়।
১৩.
একদিনে কয়েকটি মাহফিল বা প্রতিদিন মাহফিল করা থেকে বিরত থাকুন। এতে একদিকে আপনি লেখাপড়ার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে পারিবারিক কাজকর্ম গুছিয়ে নিতে পারবেন।
১৪.
সম্ভব হলে দ্বীনি দাওয়াতী কাজ তথা মাহফিলকে জীবিকার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ না করে উপার্জনের বিকল্প পন্থা অবলম্বন করুন।
১৫.
আপনি যা জানেন তাই সঠিক ও নির্ভূল আর অন্যদের জানাশোনা পুরোপুরি ভুল – এরুপ একপেশে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন।
১৬.
যশখ্যাতি লাভের দিকে মনোনিবেশ না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খুলুছিয়াতের সাথে বয়ান করুন। দুনিয়ার খ্যাতির চাইতে ক্ববুলিয়াত অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
১৭.
বিপরীত মতাদর্শের কারো নাম ধরে অশালীন ভাষায় সমালোচনা পরিহার করুন। এটা উন্নত রুচির পরিচায়ক নয়।
১৮.
হাসি রসিকতা বয়ানের অংশ হতে পারে। তবে তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয় এবং কোনভাবেই তাতে মিথ্যার মিশ্রণ না থাকে।
১৯.
বক্তার তালিকায় আপনার স্থান কত নম্বরে তা নিয়ে মোটেই ভাববেননা। দ্বীনের দা’ওয়াতে এসব সিরিয়ালের কোনই গুরুত্ব নেই।
২০.
খানা পিনা, বাসস্থান এবং অন্যান্য খিদমত প্রাপ্তি নিয়ে আয়োজকদের সাথে দুর্ব্যবহার করবেন না।
বরং তাদের শুকরিয়া আদায় করুন যে, তারা অনেক মেহনত করে আপনার দাওয়াতী কাজের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছেন।
২১.
নিজের নামের শুরুতে বাহারী রকমের উপাধি, ডিগ্রি ইত্যাদি সংযোজনে আয়োজকদের নির্দেশনা দিবেন না। ফুলের সৌরভ বা আতরের সুগন্ধি নাম উপাধি বা শ্রেষ্ঠত্ব বয়ানের উপর নির্ভরশীল নয়।
২২.
আপনার আলোচনায় যেসব তথ্য উপস্থাপন করতে চান, তার সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ভালো করে যাচাই করে নিন।
কারণ আপনি ভুল, ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করলে তা অনেকের কাছেই ধরা পড়ে যাবে। এতে আপনার মর্যাদা, ইলমী অবস্থান যথেষ্ট ক্ষুন্ন হবে, যা মোটেই সুখকর হতে পারে না।
২৩.
ক্ষেত্রবিশেষে আবেগের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই তবে অতী আবেগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খারাপ পরিণতি নিয়ে আসে- এতেও কোন সন্দেহ নেই।
২৪.
মনে রাখবেন সাইন্স এন্ড টেকনোলজিতে পৃথিবী এগিয়ে গেছে বহুদূর। বাস্তববাদী হোন, পৃথিবীর সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করুন।
২৫.
আপনি সাবধানতা অবলম্বন না করলে ভিডিও ক্লিপস হতেই থাকবে, ফতোয়া দিয়ে, ধমক দিয়ে বা জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে তা বন্ধ করতে পারবেন না। মানুষ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে যথেষ্ট সচেতন। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে জান্নাত জাহান্নামের সোল এজেন্সি আপনাকে প্রদান করা হয়নি এবং আপনার কথার উপরই কারো জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারিত হবেনা।
২৬.
হতে পারে আপনার অসতর্কতার কারণে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ম্যাসেজ যেতে পারে জনগণের মাঝে, যার দায়িত্ব আপনি এড়াতে পারবেন না। যে মহান খিদমত আপনি করে যাচ্ছেন নেক নিয়তে, পদ্ধতিগত ও চিন্তাগত ভুলের কারণে তাই হয়ে যেতে পারে আপনার জন্য তথা ইসলামের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।
২৭.
লাউড স্পিকার বা মাইকের পরিমিত ব্যবহার করুন। অপ্রয়োজনীয় শত শত মাইক ব্যবহার করে শব্দ দুষণ করবেন না।
অনেক অসুস্থ ব্যক্তি থাকেন, অনেকেই ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকেন, অনেকেই ঘুমুতে যান। তাদের জন্য আপনার মাইকের আওয়াজ যেন কষ্টের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

লেখক: এমডি, ফেয়ার ফীল প্রোপার্টিজ লিমিটেড
ঢাকা, বাংলাদেশ,
১৬ নভেম্বর, ২০২০ ঈসায়ী তারিখ, সোমবার, ০৫ঃ ৫৮ অপরাহ্ন।

Share this post

PinIt
scroll to top