বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন মঙ্গলবার

Peer-Habib0.jpg

এম এ মান্নান
বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত গণমানুষের প্রিয় পত্রিকা দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক হাজারো সাংবাদিকের গুরু, সাংবাদিক জগতের উজ্জ্বল তারকা পীর হাবিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন আজ মঙ্গলবার। দিবসটি উপলক্ষে সাংবাদিক অঙ্গণে নয় শুধু এর বাইরেও তার প্রিয়ভাজনরা কেক কাটা, দোয়া মোনাজাত ও আলোচনা সভাসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা করেছেন। হয়তো আগামী দিনে এ অনুষ্ঠান আরো ব্যাপক আকারে হবে। আমাদের বস পীর হাবিবুর রহমানকে আল্লাহ আরো দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুক। কিংবদন্তি লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও নানা গুণের অধিকারী এই পীর। তার ফেইসবুক আইডিতে তার জন্মদিনকে ঘিরে খুবই সুন্দর একটি লেখা তিনি উপহার দিয়েছেন। যা পড়লে দেশের সেরা ব্যক্তিরা তার সম্বন্ধে যে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য দিয়েছেন তা জানা যাবে। লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
জন্মদিন মানে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া! তবু প্রেম তবু এতো ভালোবাসা তবু এতোটা বাঁচার আকুতি।

আজ মঙ্গলবার। আজ আমার জন্মদিন। ১৯৬৩ সালের ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম জল-জোছনার শহর সুনামগঞ্জের ছায়া সুনিবিড় বাড়িতে। মা-বাবার সপ্তম সন্তান হিসেবে আমার আগমন ঘটেছিল। আট ভাই-বোনের সংসার ছিল আমাদের অনেক সুখের। বেদনা হয় মন, এখন আছি চার। মা বাবাকে হারিয়েছি সেই কবে। তিনভাইয়ের হৃদয় মেরামত করা, আমার হৃদয় খালি রিং চায়, তিনটি আছে। আল্লাহ আমার আয়ু বাড়িয়ে লেখা ও বলার শক্তি যেনো রাখেন এ দোয়া করবেন।আমার সম্পদ আমার অন্তর, আমার চন্দ্রস্মিতা। জন্মদিন মানেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

প্রকৃতির নৈসর্গিক দৃশ্যে মেঘালয়ের কোলে
শায়িত সুনামগঞ্জ শহরে জল, কাদা মেখে আমার বেড়ে ওঠা। আমার শৈশব ছিল চঞ্চল। হাঁটা শেখার সময় কোনো পুকুর বা ডোবা-নালায় পড়ে মরে যাই, এই ভয়ে মা কোমরে ঘুঙুর বেধে দিয়েছিলেন। কৈশোর ছিল দুরন্ত দস্যিপনার। তারুণ্য ছিল উচ্ছল প্রাণবন্ত।

উজানে সাঁতার কাটা মানুষ আমি। যুদ্ধই যার জীবন। অনেকের চক্ষুশুল বিরাগভাজন। কিন্তু অসংখ্য মানুষের ভালবাসায় সিক্ত আমার জীবন। অনেকে বলেন, আবেগ আমার শত্রু। আর আমি বলি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধই হয়েছে আবেগের ওপর। আবেগ, অনুভূতি, সাহস ও আত্মমর্যাদাবোধ যাঁর মধ্যে নেই, তাঁকে আমি পূর্ণাঙ্গ মানুষ মনে করি না।

স্কুলজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিবেদিত হয়েছিলাম। আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ হওয়ার স্বপ্ন ছিল আমার। ৮৪ সালে মরহুম আমান উল্লাহ ও রেহান উদ্দিন রেজু প্রায় টেনে নিলেন সাংবাদিকতার দিকে। তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মতিহার ক্যাম্পাস চষে বেড়াই। সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্রমিছিলের মুখ। দিনরাত নিরন্তর আড্ডায় কাটে আমার প্রাণবন্ত উচ্ছলজীবন।

দুহাত খুলে দৈনিক বার্তায় লিখি নিয়মিত গল্প। কিন্তু অস্থির-অশান্ত মন আমার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও মন টেনে নিয়ে যায়, রাজনীতির আঙিনায়। এক সময় লেখালেখিও ছেড়ে দিই। সুনামগঞ্জ থেকেই আমরা তিন ভাই পাল্লা দিয়ে পরমপরায় ছাত্রলীগ যেমন করেছি, তেমনি একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি। শহরের পরিবেশ ছিল খুব চমৎকার। আত্মার বাধনে বাধা কবিতা ও গানের শহরে মুষলধারে নেমে আসা বৃষ্টি উপভোগ করেছি। জোছনায় ভিঁজতে ভিঁজতে ঘরে ফিরেছি।

সাম্প্রদায়িক শব্দটি তখন আমরা জানতাম না। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আত্মার বাধনে ছিল আমাদের জীবন। টানাপোড়েনের সংসারে বেড়ে উঠলেও উপচে পড়া সুখ ছিল জীবনে। আত্মমর্যাদার অহমকে ছেলেবেলা থেকেই বিসর্জন দিতে শিখিনি। এ আমার অহংকার।
আমাদের সন্তানদের জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হলেও আমাদের সময় আমাদের জন্মদিন মনেই থাকত না। কখনো জন্মদিন পালনও হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে বেরিয়ে রাজনীতি করার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে সাংবাদিকতার পেশার তারে জীবনকে জড়িয়ে ফেলি। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক ও একটি শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ আমার আদর্শের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ালেও দলীয় বৃত্তের বাইরে এসে রিপোর্টিং জীবন শুরু করি।

রাজনৈতিক ও সংসদ বিষয়ক রিপোর্ট কাভার করতে গিয়ে আমি কখনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হইনি। রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টারিয়ানরা আমার পেশাগত জীবনে উদার দৃষ্টি নিয়ে সাহায্য করেছেন। মিডিয়া স্বীকৃত প্রহসন অব দ্যা রেকর্ডের বিধি আমি কখনো মানি না। নিরপেক্ষতা বলেও কোনো শব্দ আমার কাছে নেই। কবি গুরু রবি ঠাকুরের ভাষায়, সত্য সে যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম আমি-এই পথটি গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি।

সত্য যে কারও পক্ষে যেতে পারে, যে কারও বিপক্ষে যেতে পারে। অনেকে বলেন, কি রিপোর্ট, কি কলাম আমার হাতে শব্দ বাজে ঘুঙুরের মতো। সাহিত্যের রসবোধ বা ভাষার খেলা, শব্দের গাঁথুনি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি আমি। এখনো তা করি। কে কি ভাবল, কে কি বলল তার ধার ধারি না আমি কখনো। হিসেবের খাতা বাইরে রেখে আমার নিজের মতো যা দেখি, যা পর্যবেক্ষণ করি তা নিয়ে সোজাসাপটা প্রথা ভেঙে কলাম লিখতে শুরু করি। অনেকের গা জ্বললেও সারাদেশে অসংখ্য পাঠকের ভালবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মানুষের ভালবাসা ও সমর্থনকে যতটা শক্তি মনে করেছি, ঠিক তেমনি ক্ষমতার করুণাশ্রিত জীবন ততটাই উপেক্ষা করে চলেছি। কোনো সরকারের কাছ থেকে কখনো কোনো সুযোগ-সুবিধা নেইনি।

সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার চেষ্টা করেছি। কোনো ইনিয়ে বিনিয়ে নয়, যা বিশ্বাস করেছি, সোজাসাপটা, সহজ-সরল ভাষায় লিখেছি। আমার রোমাণ্টিক প্রেমিক হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতিজুড়ে রয়েছেন বিশ্বনন্দিত মানবতাবাদী লেখক রবীন্দ্রনাথ। আর মন যখন বিদ্রোহ করে ওঠে, তখন হয়ে উঠি নজরুল।

সুনামগঞ্জের প্রকৃতির সন্তান হিসেবে হাওড়-বাওড় নদী ও জলের ধারায় গানের সুরের সাথে বেড়ে ওঠা আমার মনেও নিঃশব্দে একজন বাউল বাস করেন। কবির কোমল হৃদয় রয়েছে আমার । প্রিয়জনদের মেজাজ দেখালেও, ঝগড়া করলে তা সেই মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়। বিষ পুষে রাখার স্বভাব আমার নাই।

সৃষ্টিশীল অনুভূতিপ্রবণ মানুষের মনে যে অন্তহীন হাহাকার, অতৃপ্তি, দহন ও দ্রোহ থাকে আমার চরিত্রেও তা রয়েছে। কোথাও ভালবাসা পেলে আমি বারবার ছুটে যাই। কেউ পছন্দ না করলে ভুলেও তার ধারে কাছে যাই না। তেমনি কাউকে ভাল না লাগলে ভুল করেও সে পথ দিয়ে হাঁটিনা। খোলা বইয়ের মতো জীবন আমার মানুষের সামনে রেখেছি। কারণ মানুষ ও প্রকৃতিই আমাকে বেশি টানে।

হৃদয় ক্ষয়ে যেমন প্রেমিক ও কবি হতে হয়, তেমনি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না ঘটালে লেখক, সাংবাদিক হওয়া যায় না। এটা আমি বিশ্বাস করি। নির্জীবের দীর্ঘ জীবনের চেয়ে, বীরের স্বল্প জীবন যেমন অনেক মূল্যবান বলে বিশ্বাস করি, তেমনি কেরানি সাংবাদিকতা আর দলবাজিতে ডুবে থাকা আমার চোখের বিষ। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের মত অনুসারে, আমি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তেমনি দীর্ঘ পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতায় একটি শক্তিশালী ভারসাম্যমূলক সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই যে উত্তম সেটি আমি বিশ্বাস করি।

এই পেশায় আমি অর্থ-বিত্তের মোহে আসিনি। অমিত সাহস নিয়ে মানিক মিয়া হতে এসেছিলাম। সময় এবং বাস্তবতার কাছে সেই সাহস হোঁচট খেয়েছে। আমিও এখন কিছুটা আপোস করে চলি। মাঝে মধ্যে মনে হয়, জীবনে আর কিছু শিখিনি বলে এই পেশায় পড়ে আছি। মানুষের জীবন অনেক ছোট। তারমধ্যে রয়েছে নিরন্তর লড়াই। সেখানে এক মুহূর্তের আনন্দই জীবনের অমূল্য সম্পদ মনে করি।

জীবনে কখনো জন্মদিন পালন না হলেও আমার ৫০ বছর পূর্তিতে স্বজনদের উদ্যোগে গুলশান ক্লাবে “পীর হাবিবুর রহমানের অর্ধেক জীবন” শিরোনামে এক বর্ণাঢ্য আনন্দ-আড্ডা হয়েছিল। বরেণ্য মানুষেরা এসেছিলেন। শুভকামনা জানিয়েছেন। একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল। সেটিতে বরেণ্য মানুষেরা আমাকে নিয়ে তাদের ¯স্নেহ ভালবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে লিখেছিলেন, ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছিলেন।

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক তখন উত্তরের নগরপিতা হননি। তিনি লিখেছিলেন, চরম সত্য যেকোনো মুহূর্তে অবলীলায় বলতে পারা পীর হাবিবের বড় গুণ। তাঁর লেখার ভক্ত-পাঠক হয়তো স্বীকার করবেন যে, তাঁর সাংবাদিকতার শুরু থেকে তিনি কোন পথে কিভাবে হাঁটবেন, এটা তাঁর কাছে পরিস্কার ছিল।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেকমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু লিখেছিলেন, পীর হাবিবের সব মহলে যোগাযোগ খুব ভাল। আমি বলব, ওয়েল কানেক্টেড পারসন। যে সাংবাদিকতা করতে চায় বা কলাম লিখে, যদি সে ওয়েল কানেক্টেড না হয়, তাহলে তার লেখার মধ্যে ভাল কিছু আমরা আশা করতে পারি না। এটা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যেও খুব বেশি লক্ষ্য করা যায় না। পীর হাবিবের মধ্যে মানুষের সাথে সম্পর্ক নির্মাণের জায়গাটা খুব প্রশস্ত। তাঁর লেখা যখন পড়ি মনে হয়, সে আমার মুখোমুখি বসে গল্প করছে।

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার লিখেছেন, পীর হাবিবের লেখার প্রিয় বিষয় রাজনীতি। বাংলাদেশের যে কয়জন সাংবাদিক অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় পারদর্শী পীর হাবিব তাঁদের অন্যতম। পীর হাবিব যেমন প্রাণচঞ্চল, তেমনি তাঁর রয়েছে মহব্বত ভরা হৃদয়।

সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান লিখেছেন, আমি দেখেছি, যেকোনো বিষয়ে তিনি দ্রুত যুক্তিগ্রাহ্য করার চেষ্টা করতে পারেন এবং সে ব্যাপারে পীর হাবিব আসলেই প্রশংসার দাবিদার।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু লিখেছেন, বীরমুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আপোসহীন বলেই পাঠক হৃদয়ে আন্দোলিত ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ধারণের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ পীর শত ঘাত-প্রতিঘাত ও আন্দোলনমুখর সময়েও অসুস্থদের সঙ্গে আপোস করেননি।

সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন লিখেছেন, পীর হাবিব লেখেন চমৎকার। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারাটা পরিস্কার দেখতে পাই। কোনো লুকোচাপা, ভান-বনিতা, কাউকে তোয়াজ বা খুশি করার জন্য পীর হাবিব কলম ধরেন না। লেখে বিশ্বাস থেকে, অকপট সরল এবং রসালো ভঙ্গিতে- যা একজন প্রকৃত কলামিস্টদের হওয়া উচিত। তাঁর অনেক লেখা পড়ে আমার সকালবেলাগুলো সুন্দর হয়ে গেছে।
মরহুম কিংবদন্তি সাংবাদিক এ বি এম মুসা লিখেছেন, আমার ¯স্নেহহভাজন পীর সাংবাদিকতা করেন বিশুদ্ধ পন্থায়। প্রয়োজনে কলমে আঘাত দিয়ে অথবা মুখের তবড়িতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আর ধর্মান্ধতাকে নাস্তানাবুদ করেন। এই পীর আমার মুরিদ। আমি তাঁকে ভীষণ স্নেহ করি। আমার পারিবারিক অনুষ্ঠানের মধ্যে বুড়াবুড়িদের মধ্যে তাঁকে যখন দেখি, টকশোর দুর্মুখ পীরকে দেখি না। তখন সে ভদ্র, বিনয়ী, নম্র এক মানুষ। যদিও লেখে সাহসের সঙ্গে, টক-শোতে ঠাস ঠাস বলে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের লিখেছেন, ইতিহাসের আলোকে নির্ভেজাল সত্যকে পুঁজি করে কাব্যিক ভাষায় লেখা টেনে নেয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে পীর হাবিবের। তাঁর লেখা পড়া শুরু করলে শেষ না করে অন্য কাজে মন বসে না। চমৎকার লেখনি শক্তি দিয়ে পীর হাবিব তৈরি করেছেন এক বিশাল পাঠকমহল। পীর হাবিব ভাটি অঞ্চল সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান। সে হাওড় ভালবাসে, ভালবাসে জোছনার চাঁদ। আমি যখন ছাত্রলীগের সভাপতি, তখন তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। ছাত্রজীবন থেকেই সে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আমি চেয়েছিলাম, হাবিব রাজনীতিতে উঠে আসুক। রাকসু নির্বাচনে নজর কাড়ার পর মনে হয়েছিল, সে পারবে। তাঁকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী সুনামগঞ্জের এক কৃতি সন্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে হাবিবের ঠাঁই হলো না। ঠাঁই হলে রাজনীতিতে ভাল করার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। সাংবাদিকতার শুরু থেকেই পর্দার আড়াল থেকে তথ্য বের করে আনতে সাফল্য দেখায় অবিরত। সে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হয়নি। তাঁর লেখা কলাম পড়ার সুযোগ পাই, যখন আমি কাশিমপুর কারাগারে। প্রথম ভেবেছিলাম, পীর হাবিবের লেখা এমন আর কি! কিন্তু পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়ে যাই। ইতিহাসের আলোকে নির্ভেজাল সত্য পুঁজি করে কাব্যিক ভাষায় লেখা টেনে নেয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। এক সময় রিপোর্টার হিসেবে পাঠকমহলে নাড়া দিয়েছে বারবার। আর কলাম লিখতে গিয়ে দেখিয়েছে সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলার প্রবণতা। অদৃশ্য স্বার্থের কাছে যেমন মাথা নত করেনি, তেমনি বিবেকের সাথে প্রতারণা করেনি।

মরহুম প্রখ্যাত সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার লিখেছেন, পীর হাবিব বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক। এমন আলঙ্কারিক পদে নয়, আমার সঙ্গে কাজ করা কালে দেখেছি, সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে রিপোর্টার হিসেবে। আসলেই পীর হাবিব একজন আপাদমস্তক রিপোর্টার।

অকাল প্রয়াত সিনিয়র সাংবাদিক জগলুল আহমদ চৌধুরী লিখেছেন, পীর হাবিবের লেখা পড়ে আমার কখনো ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে না। বর্তমান সময়ে দীর্ঘ রাজনীতি কলামের যে আকর্ষণ পীর সৃষ্টি করতে পেরেছেন এটা অনেকটা অভাবনীয়।

রাজনীতির কিংবদন্তী তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, পীর হাবিবের লেখার ভাষা সহজ,সরল মার্জিত, যা সাধারণেরও বোধগম্য। তাঁর লেখায় আবেগ উৎসারিত হয়। গভীর দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা থেকে। লেখার বিষয়ে সে এতটাই আন্তরিক যে, সে যেটি প্রয়োজন মনে করবে তা লিখবেই। এ বিষয়ে কোনো তাঁর অভিধানে নেই।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম লিখেছেন, রাজনীতির নিষ্ঠুরতা, নোংরামি তাঁর পছন্দ নয়। বাস্তবতাকে আড়াল করার পক্ষে নয়। তাঁর প্রেমিক হৃদয়ে জ্বলসে ওঠে দেশপ্রেম। কাঠিন্যকে আঘাত করেন দুঃসাহস নিয়ে। সমাজ ও রাজনীতির নিষ্ঠুর পরিণতির চিন্তা তাঁকে থামাতে পারে না। সত্যেও পেছনে ছুটেন। তাঁর সাহসী শক্তিশালী লেখনীর যাদু আমাকে বিস্মিত করে।

নতুন ধারার সাংবাদিকতার প্রবর্তক নাঈমুল ইসলাম খান লিখেছেন, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অনেকখানি প্রভাবিত ও পরিচালিত হয়েছে কিছু প্রাণবন্ত সাংবাদিক শক্তিশালী লেখার কারণে। এত তীক্ষ্ণ ও তথ্যবহুল তেজস্বী লেখা, এত গভীরভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আলোকিত সাংবাদিকতা একক পত্রিকায় এর আগে কিংবা পরে বাংলাদেশে দেখা যায়নি। এই লেখক, সাংবাদিকরা জনগণের চোখে হয়ে উঠেন উজ্জ্বল তারকা। পীর হাবিব ছিলেন সেই তারকার মধ্যে সেরা তারকা।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম লিখেছেন, কয়েক বছর ধরে আমি তাঁর লেখার এক অনুরাগী পাঠক। খুবই ধারালো লেখা, গতি লয়তাল সমান সমান। একবার চোখ পড়লে শেষ না করে পারা যায় না।

প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক লিখেছেন, ইদানিং তিনি পত্রপত্রিকায় কলাম লিখছেন। এক্ষেত্রে তাঁর মেধা ও স্বকীয়তার ছাপ পাওয়া যায়। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র উপকৃত হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখেছেন, তাঁর লেখনির যৌক্তিকতা এবং প্রকাশ ভঙ্গি আমাকে আকৃষ্ট করে। পীর হাবিব সেই মাপের সাংবাদিক, যিনি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারেন।

মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছেন, অদম্য সাহস দেখেছি তাঁর মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সেই যুবক এখন একজন পরিপূর্ণ সাংবাদিক। তাঁর লেখায় মুন্সিয়ানা আছে, দলবাজি নেই।

সাবেক ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না লিখেছেন, চিন্তা এবং লেখায় আমি খেয়াল করি পীর একটি লাইন ধরে এগোন। এর মানে পীর একরোখা নয়। একরোখা, একগুঁয়ে, অন্ধস্তাবক অনুগত বৃত্য নয়। পীরের রাগ আছে, জেদ আছে, তার প্রকাশও আছে। তাঁর লেখা এবং টক-শোয় তা স্পষ্ট। পীর ভিন্নমতের যুক্তি শোনেন, তা নিয়ে ভাবেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন।

মরহুম সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ লিখেছেন, সবকিছু ছাপিয়ে যায়, তাঁর লেখনির গুণাবলিতে। এই অল্পমধুর মিশ্রণের মধ্যে রয়েছে এক নতুন স্বাদ। পীর হাবিবের সঙ্গে আছে আমার সেই স্বাদের এক মধুর সম্পর্ক। যা আমি উপভোগ করি একান্তভাবে।

সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ লিখেছেন, বিভক্ত বাংলায় সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যেও সহযাত্রা বিমানের প্রতীক যেমন আবুল মনসুর আহমদ, তোফাজ্জাল হোসেন মানিক মিয়া তাদের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাংবাদিক হবে পীর হাবিবুর রহমান- এই প্রত্যাশা করি।

যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সাইফুর আলম লিখেছেন, ভালবাসার অন্ধত্ব আছে, ঘৃণার দাপটও আছে, এরকমই পীর হাবিবুর রহমান। প্রকৃতির মতো, ঝড়-বৃষ্টি-বাদল-খরা সবই ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে। এমন মানুষের সাথে চলতে পারাটা বড় কথা।

মরহুম মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী লিখেছেন, ওর লেখার যে গুণটি আমাকে আকৃষ্ট করে, তা হচ্ছে চারপাশের বাস্তবতা সম্পর্কে নিজেকে ওয়াকেবহাল রাখার দক্ষতা। একজন সফল সাংবাদিকের প্রথম প্রয়োজনই হচ্ছে, চোখ-কান খোলা রেখে চলতে পারা।

প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত লিখেছেন, দেশের মঙ্গলের চিন্তায় সে নীতিপ্রথা মানেনি। স্টেরিও টাইপ ছাত্রলীগ হতে হবে- এ ধরণের কোনা সংকীর্ণতায়, নীতিপ্রথায় সে আটকে থাকেনি। প্রথা ভাঙার দুঃসাহিসকতা তাঁর ছিল।

মরহুম রাজনীতিবিদ কাজী জাফর আহমদ লিখেছেন, তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অন্তঃদৃষ্টি নিয়ে তিনি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করেন। যা বলতে চান, সোজাসাপটা লিখতে পারেন। পীর হাবিবের আগেও আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয় কলামিস্ট তাদের লেখার মাধ্যমে পাঠকহৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চ। জহুর হুসেন চৌধুরীর বিখ্যাত দরবার-ই জহুর উল্লেখ করা যেতে পারে। পীর হাবিব বিষয়বস্তু নির্বাচন, সাবলীল বাচনভঙ্গি এবং অনুপম রচনাশৈলীর কারণে এরমধ্যে পূর্বসূরীর কলামিস্টদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন।

Share this post

PinIt
mamannan537

mamannan537

I'm M A Mannan. I'm a founder principal of Excellent School & Madrasah It's new name is Darul Ihsan Qasimia (Excellent) Madrasah. It's situated at Phulpur in Mymensingh. I'm also a journalist. I write in The Daily Tathyadhara, The Dainik Bangladesher Khabor and Bangladesh Pratidin.

scroll to top