ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের পরিবার আজও অবহেলিত

Haluaghat-Pic-3.jpg

মো. আব্দুল মান্নান :
ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার শুধু ময়মনসিংহের নয় বরং পুরো বিশ্বের বাঙালী জাতির গর্ব ও অহংকার। বাঙালীর মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রকে যারা নিজের জান দিয়ে রুখে দিয়েছেন আব্দুল জব্বার তাদেরই অন্যতম একজন। এই বীর পুরুষ আব্দুল জব্বারের পরিবার আজও অবহেলিত। আব্দুল জব্বার ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাচুয়া গ্রামে ১৯২৭ সনে জন্ম গ্রহণ করলেও দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই সেখানে তার আর কেউ নেই। বাবা মৃত হাসেন আলী তার আগেই মারা গেছেন। আব্দুল জব্বার তার বাবার একমাত্র সন্তান। তবে বাবার মৃত্যুর পর তার মা সাফাতুন্নেছার দ্বিতীয় বিয়ে হয় তার চাচার সাথে। ওই তরফের দিক থেকে আব্দুল জব্বারের আরো দুই ভাই ও এক বোন রয়েছেন। ১৯৫০ সালের দিকে মা সাফাতুন্নেছা ওই এলাকা ত্যাগ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আত্মীয় স্বজনের সাথে বসতি স্থাপন করেন একই জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা শিমুলকুচি গ্রামে। ছোটবেলায় বহুবার আব্দুল জব্বার এখানে এসেছেন এমনকি তিনি শহীদ হওয়ার মাত্র আটদিন আগেও মাকে দেখার জন্য এই শিমুলকুচি গ্রামে এসেছিলেন। আব্দুল জব্বারের একমাত্র ছেলে নুরুল ইসলাম বাদল। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত সেনা ওয়ারেন্ট অফিসার। একাত্তরে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা এই বাদলের ২ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে সরকারী চাকরিজীবি লুৎফুন্নাহার শুভার বিয়ে হয়েছে গফরগাঁওয়ে। ছোট মেয়ে আফরোজা খাতুন রুবার বিয়ে হয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলার নড়াইল ইউনিয়নের গোপীনগর গ্রামে মাওলানা দেলোয়ার হোসেনের সাথে। আর একমাত্র ছেলে ফারজুল ইসলাম বিজয় অটিস্টিক।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হলেও আজও পর্যন্ত ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের বাড়িতে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। ক্ষেতের আল দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। বর্ষাকালে তাদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ । আব্দুল জব্বারের নাতনী আফরোজা খাতুন রুবা বলেন, আমাদের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় আমার ছোটভাই অটিস্টিক ফারজুল ইসলাম বিজয় বাড়িতে আসতে পারেন না। অনেক দর্শনার্থী আসেন তাদেরও কষ্ট হয়। মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তা করলেই এই কষ্টটা লাঘব হতে পারতো। তাদের একটি পুরনো টিনশেড হাফ বিল্ডিং থাকলেও নেই কোন বিদ্যুৎ। রুবা আরো বলেন, আমার দাদাজান ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের নামে গফরগাঁওয়ে যাদুঘর করা হয়েছে। সেখানে আমাদের কেউ নেই। আমরা সেটা এখানে করার জন্য মানববন্ধন এমনকি অনশন পর্যন্ত করেছি। কিন্তু হয়নি। সেখানে নয়ন নামে একজন শহীদ জব্বারের ভাই দাবী করলেও নয়ন আমাদের কেউ নয়। তার নাম কবরের নেম প্লেট থেকে বাদ দিতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকার তেজগাঁয়ে সরকার শহীদ জব্বারকে নামে মাত্র এক টুকরো জায়গা দিয়েছে কিন্তু একটি টিনশেড ব্যতিত কিছু করে দেয়নি। সন্তানহীন শহীদ জব্বারের এই নাতনি নিজের জন্য একটি চাকরি চাওয়ার পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতেরও দাবি জানান।
শিমুলকুচি গ্রামে শহীদ আব্দুল জব্বারের নামে ২০০৭ সালে ‘ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১০ সালে উহাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধিত করা হয়। এই শিমুলকুচি গ্রামে তার নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি শহীদ মিনার, একটি মসজিদ ও মসজিদ পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই গ্রামের নুরুল হুদা বলেন, আব্দুল জব্বার শহীদ হওয়ার মাত্র আটদিন আগে এখানে তার মাকে দেখার জন্য এসেছিলেন। একই গ্রামের এরশাদুল ইসলাম বলেন, গফরগাঁওয়ে তার কেউ নেই। শহীদ জব্বারের আত্মীয় স্বজন সবাই এইনো। এইনো এত কিছু থাইক্যাও উল্লেখযোগ্য আমরা কিছুই পাইলাম না। আমাদের রাস্তাঘাটগুলো পর্যন্ত আজও হয়নি। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. আতিকুল্লাহ বলেন, শহীদ আব্দুল জব্বারের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন নানাবিধ কারণে ও অসহযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। েএর মধ্যে অন্যতম একটি হলো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললে এই শিমুলকুচি গ্রামে অনেক কিছুই হবে। শহীদ আব্দুল জব্বার জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ আবু হানিফা বলেন, এখানে একটি পাঠাগার দেওয়া হয়েছে। পাঠাগারে মাত্র ২০/৩০টি বই। পাঠকরা আরো বই দাবি করেছেন। কথা হয় শহীদ জব্বারের মামাত ভাই আবুল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, শহীদ জব্বার আমার খেলার সাথী ছিল। তার স্মৃতি রক্ষার্থে ২০১১ সনে স্ত্রী আমেনা খাতুনের ফলক সম্বলিত ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের উদ্যোগে বাড়ির পাশে একটি শহীদ মিনার করা হয়েছে, তাও মাঠের ভিতর। ওখানে যাওয়ার একটি পথও নাই। শহীদ আব্দুল জব্বারের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা বিষয়ে জানতে চাইলে গাজিরভিটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, ওখানে তারা কেউ থাকেন না। তাই রাস্তাঘাট করা হয় না। তিনি আরো বলেন, উপজেলা টু উপজেলা, উপজেলা টু ইউনিয়নেই রাস্তা নেই। আর আপনি আছেন এইডা লইয়া। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের একমাত্র পুত্র অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাদল বলেন, আমাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য একটা রাস্তা প্রয়োজন। এটা উত্তর দিক দিয়ে বর্ডারের রাস্তা থেকেও হতে পারে অথবা বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়েও হতে পারে। তিনি আরো বলেন, সরকার আমাদের জন্য অনেক কিছুই করতে চায়, তবে কিছু লোক বাধা হয় বলে অনেক কিছুই হয় না। এখানে কিছু হলে সেটা শুধু আমরা কেন দেশের সবাই সুবিধা নিবে। তাহলে কেন এত বাধা? এ বিষয়ে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন বলেন, হালুয়াঘাট তো অনেক দিক দিয়েই পিছিয়ে আছে। রাস্তা নেই, তবে আস্তে আস্তে রাস্তা হবে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে মিলাদের জন্য আমরা কিছু ক্যাশ দিয়ে থাকি। ইতোমধ্যে তা দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, খুব শিগগিরই ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা নির্মাণ ও সৌর বিদ্যুৎ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share this post

PinIt
mamannan537

mamannan537

I'm M A Mannan. I'm a founder principal of Excellent School & Madrasah It's new name is Darul Ihsan Qasimia (Excellent) Madrasah. It's situated at Phulpur in Mymensingh. I'm also a journalist. I write in The Daily Tathyadhara, The Dainik Bangladesher Khabor and Bangladesh Pratidin.

scroll to top