২ ফেব্রুয়ারি শায়খে বালিয়া গিয়াছ উদ্দিন (রহ)’র ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী

Pir-Saheb-Balia.jpg

এম এ মান্নান :
২০১৩ সনের ১ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত বালিয়ার ৯৪তম বড় সভার শেষ রাতে অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহ উলামার অভিভাবক শায়খে বালিয়া পীরে কামিল আলহাজ্ব হযরত মাওলানা গিয়াছ উদ্দিন আহমদ পাঠান (রহ্.) ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। তিনি ইলমে ওহীতে সমৃদ্ধবান আমলদার সাদা মনের একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তাকে হারিয়ে ময়মনসিংহের আলেমরা এতীমসম। পিতার বলে যেমন মানুষ বলিয়ান হয় তেমনি শায়খে বালিয়ার বলে বলিয়ান হতো, উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হতো এদেশের উলামায়ে কেরাম। চোখের সামনে আজ সবই আছে, নেই শুধু শায়খে বালিয়া। তাতে মনে হয় যেন কেউ নেই। ‘মাওতুল আলিমে মাওতুল আলাম’ অর্থাৎ একজন আলিমের মৃত্যু যেন পুরো পৃথিবীর মৃত্যুসম। বাক্যটি এই বিদগ্ধ আলিমের ক্ষেত্রে যেন শতভাগ প্রযোজ্য। শায়খে বালিয়ার মধ্যে থাকা অলৌকিক শক্তিশালী চুম্বক মানুষকে আকর্ষণ করতো, কাছে টানতে পারতো। সদা মানুষ তাকে ঘিরে রাখতো। তিনিও গণমানুষের উপকারে ঝাপিয়ে পরতেন। ভুল বুঝে অনেকে শায়েখে বালিয়ার দুর্ণাম রটনা, গীবৎ শেকায়েত এমনকি তার সাথে রূঢ় আচরণ করলেও তিনি কারও গীবৎ করেননি, কারও সাথে মন্দ আচরণ করেননি। আজ এমন একজন শায়েখের অভাব ময়মনসিংহবাসী হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছে। প্রখর রৌদ্রে বড় বটবৃক্ষের ছায়ায় গিয়ে মানুষ যেমন শান্তি লাভ করে হযরত আবু বকর (রা.) চরিত্রের শায়খে বালিয়া এ দেশের মানুষের জন্য তেমনি একটি বটবৃক্ষস্বরূপ ছিলেন। যে কোন বিপদ আপদে উলামায়ে কেরাম তার পরামর্শ ও সহযোগিতা নিতেন। তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ উলামাকে নিয়ে গঠিত ‘ইত্তেফাকুল উলামা’ সংগঠনের মজলিসে শুরার সভাপতি ছিলেন। শায়খে বালিয়া (র.) বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল উলামার আধ্যাত্মিক নেতা ও অভিভাবক ছিলেন। তিনি শুধু মসজিদ মাদ্রাসা বা ইসলামী জলসার সভাপতি ছিলেন না বরং গ্রাম্য ও সামাজিক দরবারেরও সভাপতি রাখা হতো তাকে। মেম্বার চেয়ারম্যান থেকে নিয়ে এমপি পর্যন্ত সবাই সমীহ করতো এই কীর্তিমান পুরুষকে। তিনি এতই কোমল চরিত্রের মানুষ ছিলেন যে, তার কাছে সবাই যেতে পারতো, মনের কথা গুছিয়ে বলতে পারতো। যে তার সংস্পর্শে একবার গিয়েছে বা বসেছে সেই বলাবলি করে ‘হুজুর আমাকে বেশি ভালবাসতেন।’
তাঁর প্রিয় উস্তাদ ও শায়েখ নূরুদ্দীন গহরপুরী (রহ্.)’র তত্ত্বাবধানে তিনি হাদীস, তাফ্সীর ও ফিক্হে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ ও গবেষণার পর ১৯৬০ সনে পীরের মাদ্রাসা জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়ায় কর্মজীবনের সূচনা করেন। পরে মুরুব্বীদের আদেশ ও পীরের হুকুমে ১৯৬৮ সনে তিনি বালিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সন থেকে ২০০০ সন পর্যন্ত বালিয়া মাদরাসার মুহতামিমের পদ, শায়খুল হাদীসের পদ ও জীবনের শেষ দিকে বালিয়া মাদরাসার সদরুল মুহতামিম পদ অলংকৃত করাসহ ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলের আনুমানিক পঞ্চাশোর্ধ মাদ্রাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন শায়খে বালিয়া (রহ.)। জীবনে প্রচুর ছাত্র গঠনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক লাইনে ১১ জন মুরীদকে তিনি খেলাফত দিয়ে গেছেন। শায়খে বালিয়া (রহ্.) দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এমনকি সুদূর লন্ডন পর্যন্ত ওয়াজ নসীহত ও দারসে বুখারীর খেদমতের মাধ্যমে দীনী দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
২০১৩ সনে ২ ফেব্রুয়ারী ভোর রাতে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্তে অসুস্থতা নিয়েই মধ্যরাতে বয়ান, খতমে বুখারী ও মুনাজাত পরিচালনা করেন শায়খে বালিয়া। এরপর জামিয়ার অফিসে কিছুক্ষণ বসে মুহতামিম মাওলানা আইনুদ্দীন ও তৎকালীন নায়েবে মুহতামিম মাওলানা ওয়াইজুদ্দীনকে দিক নির্দেশনামূলক নসীহত করে মাদ্রাসা সংলগ্ন বাসায় যান। বাসায় যাওয়ার পর পরই অসুস্থতা বেড়ে গেলে দ্রুত তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটের সময় কালেমা পড়তে পড়তে শায়খে বালিয়ার ইন্তিকাল হয়। বড়সভা মঞ্চের মাইকে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সভাস্থল ও গ্রামগঞ্জের লোকেরা এতীমের মত কান্না শুরু করে। কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ২ ফেব্রুয়ারী বিকালে ঐ বড়সভার মুসল্লীরা স্মরণকালের বৃহৎ জানাজার নামাজ আদায়ান্তে ঘরে ফেরেন। শায়খে বালিয়া কী যে এক বুজুর্গ ছিলেন, তাকে যায় না ভুলা। তিনি দুনিয়ায় থাকতে যেভাবে মানুষ তাকে চতুর্দিকে টানত, মরার পরও কাছে পাওয়ার জন্য, কাছে রাখার জন্য তাকে নিয়ে টানাটানি হয়। দুই জায়গায় দুটি কবর খনন করে প্রত্যেকেই নিজেদের খননকৃত কবরে শায়খে বালিয়ার লাশ রাখতে তোলপাড় শুরু করেন। এক পর্যায়ে দা লাঠি নিয়ে হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়লে কিশোরগঞ্জের আল্লামা আজহার আলী আনোয়ার শাহ এতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন। তিনি মাদ্রাসা মসজিদের সামনে ৩য় আরেক কবর খনন করে হুজুরকে দাফনের সিদ্ধান্ত দেন। পরে উভয় গ্রুপের নেতারা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিলে পরিস্থিতি প্রশমিত হয়। শায়খে বালিয়া (রহ.)’র জন্ম ১১ মার্চ ১৯৩৯ ইং ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বালিয়া গ্রামে। তার পিতা ছিলেন মরহুম তৈয়্যব উদ্দিন পাঠান ও মাতা মরহুমা হাসান বানু বেগম। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তার ছাত্র জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে সিলেটে পীরে কামিল হযরত মাওলানা মরহুম নূরুদ্দীন গহরপুরী (রহ্.)এর তত্ত্বাবধানে। আর কর্মজীবন কেটেছে নিজ এলাকার জামিয়া আরাবিয়া আশ্রাফুল উলূম বালিয়ায়। তার ২ স্ত্রীর ১জন বেঁচে আছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ৮ পুত্র ও ১২ কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতে আ’লা মাক্বাম দান করুন।

Share this post

PinIt
mamannan537

mamannan537

I'm M A Mannan. I'm a founder principal of Excellent School & Madrasah It's new name is Darul Ihsan Qasimia (Excellent) Madrasah. It's situated at Phulpur in Mymensingh. I'm also a journalist. I write in The Daily Tathyadhara, The Dainik Bangladesher Khabor and Bangladesh Pratidin.

scroll to top