প্রভাবশালীরা রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত হলে ঠিক হয়ে যাবে এ সমাজ

M-A-Mannan.jpg

এম এ মান্নান
গোমূর্খ বা অশিক্ষিতদের কথা দূরে থাক। আলেম, শিক্ষিত, বিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা নেতানেত্রী প্রভাবশালী আদর্শবান বলে পরিচিত ব্যক্তিদের কথা বলি। তারা রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত হলে, পুরোপুরি সুন্নাতের উপর উঠে আসলে বা আদর্শের মাপকাঠিতে ঠিক হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে এ সমাজ। এমনই ধারণা অভিজ্ঞমহলের। সমাজ যাদেরকে সুশীল আদর্শ মানুষ বা নীতি নির্ধারক হিসেবে মূল্যায়ণ করে, যাদের পথ অনুসরণ করে চলে এমন ভদ্রলোকদের মধ্যে রমজান কি কোন প্রভাব ফেলেছে? প্রতি বছর রমজান আসে যায় কিন্তু আমাদের প্রভাবশালী ও সুশীল সমাজে আসে না ব্যাপক কোন পরিবর্তন। রমজান যেন তাদের দিয়ে যায় না নতুন কোন বার্তা। এভাবেই কি কেটে যাবে জীবন? কবরে যাওয়ার আগে লাগবে না কি গায়ে পরিবর্তনের হাওয়া? কই? তাদের অধিকাংশ তো ফরজিয়্যাতের আমলটুকুও করেন না। গায়েবের প্রতি যাদের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে, তারা কেমন করে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতসহ ফরজিয়্যাতকে ভুলে থাকেন? আর কেমনেই বা প্রিয় নবীর রেখে যাওয়া আদর্শকে ভুলে বিজাতীয় আদর্শে নিজেকে সজ্জিত করেন? অথচ আল্লাহ বলেন, ‘লাক্বাদ কানা লাকুম ফী রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ্।’ কোন্ আমল কিভাবে করতে হবে এর জন্য নবীই হলেন তোমাদের সামনে উত্তম নমুনা। এসব বিষয় আসলে, নবীর আদর্শ মানতে হবে স্বীকার করেও মানেন না অনেকে। আর এর প্রধান কারণ, গায়েবের প্রতি বিশ্বাসের অভাব।
রমজান গায়েবের প্রতি মুমিনের বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে। অন্যায়কারী মনে করে তার অন্যায় কেহ দেখেনি বা বুঝেনি। আর রমজান শেখায় যে, আল্লাহ সব দেখেন ও বুঝেন। তাই রমজানে প্রভাবিত ব্যক্তি গোপনেও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকেন। অনেকে রমজানকে ঘিরে ইসলাহের নিয়্যাত করেন। দাঁড়ি রাখেন, নামায শুরু করেন। মিথ্যা ও অন্যায় কাজ বর্জন করেন। আর যে প্রকাশ্যেই অন্যায় করে বেড়ায়, বুঝতে হবে সে রমজানে প্রভাবিত হয়নি। দেখা যায়, সুন্নাতে অনভ্যস্থ ব্যক্তি পত্র পত্রিকায় লিখছেন বা ওয়াজের ময়দানে অথবা টিভিতে বসে বয়ান করছেন। মাদরাসায় বা বিদ্যালয়ে পাঠ দান করছেন। সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন। তাদের বয়ানে গণমানুষের বিশেষ ফায়দা হলেও তাদের নিজেদের যে তেমন কোন ফায়দা হচ্ছে না তা কিন্তু সুস্পষ্ট। যে বয়ান নিজেকে প্রভাবিত করে না তা অন্যের মধ্যেও তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। এগুলো খুবই সহজ বিষয়। আমরা কেন বুঝি না? নিজে মিষ্টি খাওয়া ছেড়েই অন্যকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করতে হয়। নিজেরা অন্যায় কাজে জড়িয়ে থেকে ছেলেমেয়ে বা অধীনস্থদের অন্যায়ে মানা করলে তেমন ফলপ্রসূ হওয়া যায় না। আমরা নিজেদের সুবিধামত কিছু আইন মেনে চলি আর বাকিগুলো এঁড়িয়ে চলি। তা আল্লাহ কেন, দুনিয়ার কোম্পানীর সাধারণ কোন মালিক কি মেনে নিবেন? নিবেন না। কোম্পানীতে থাকতে হলে যেমন পুরা রুলস মেনে চলতে হয়, তেমনি দীন ইসলামে থাকতে হলেও পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলতে হয়। আল্লাহর আইন পুরাপুরি মেনে চলা বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন- ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আমানুদখিলু ফিসসিলমি কা-ফফাহ্।’ হে ঈমানদারগণ, তোমরা পুরাপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে থাকবে এবং সব ধরনের ফ্যাসিলিটিজ বা সুবিধা ভোগ করবে অথচ আল্লাহকে মেনে চলবে না তা কেমন করে হয় ? তাদেরকে আল্লাহ পাকের দেয়া অফুরন্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সূরা রহমানের ৩৩নং আয়াতে তিনি বলেন- ইয়া মা’শারাল জিন্নি ওয়াল ইনসি ইনিসতাত্বা’তুম আনতানফুজু মিন আক্বতারিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ফানফুজূ লা তানফুজূনা ইল্লা বিসুলতান। ‘হে জিন ও ইনসান, যদি তোমাদের শক্তি সামর্থ্য থাকে তবে আমার আসমান জমিন থেকে বের হয়ে যাও। পারবে না। কারণ, তোমরা যেখানে যাবে সেখানেই রয়েছে আমার রাজত্ব। আমার রাজত্বেই যেহেতু থাকবে তবে আমাকে মেনে চল। কিভাবে মেনে চলতে হবে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘ক্বুল ইনকুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিউনী।’ বলুন হে নবী, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাকে মেনে চলতে চাও তবে আমার অনুসরণ কর। যারা নবীকে অনুসরণ করে চলবে তারা যেন পক্ষান্তরে আল্লাহকেই মেনে চলল।
সমাজের ভাল বলে পরিচিত প্রভাবশালী মাতাব্বর আলেম শিক্ষিত জ্ঞানী গুণী শ্রেণীর লোকদের আমলের দিকে আমরা যদি তাকিয়ে দেখি তবে দেখতে পাব তাদের অনেকের মধ্যেই নবীর আদর্শ বা সুন্নাতের আমল ঠিক নেই। রমজান হল ঠিক হওয়ার মাস। ইসলাহের মাস। এই মাসেও কি তারা ঠিকঠাক হতে পারেন না? কিন্তু হননি। দাঁড়িকাটা, মিথ্যা, চোগলখোরী, তোহমদ, সুদ, ঘুষ, পরনিন্দা ছাড়েননি। তারপরও এ সমাজ তাদেরকে আদর্শ, মান্যবর জ্ঞানী গুণী হিসেবে মূল্যায়ণ করে যাচ্ছে। যারা অনাদর্শ তারা তা জানেন। যদিও লজ্জা শরমে মানুষ তা মুখ ফুটে না বলুক। কিন্তু তাদের কি অন্তত: রমজানকে ঘিরেও সংশোধন হওয়া উচিৎ নয়? সময় শেষ হয়ে আসলেও এই অতি উচিৎ কাজটি কিন্তু তারা করছেন না। বড়ই পরিতাপের বিষয়!
দেশের শুধু স্কুল নয় বরং মাদ্রাসাগুলোতেও এমন অনেক শিক্ষক বা পরিচালক রয়েছেন যারা সুন্নাতের ধার ধারেন না। তাদের নিকট থেকে আমাদের সন্তানাদি সুন্নাতী যিন্দেগী শিখতে পারবে কি? পারবে না। সুন্নাত বিষয়ে তারা এঁড়িয়ে যান। সুন্নাত এঁড়িয়ে চলার কোন সুযোগ নেই। নবী করীম (সাঃ) বলেন, আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে গেলাম। যে এই দুটি জিনিস অর্থাৎ কুরআন ও আমার সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে সে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু আফসোস! কুরআন সুন্নাহ্ এ সমাজে আজ বড়ই অসহায়! মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে সরকার আলিয়া মাদরাসাগুলোতে সমমানের নামে যে ফ্যাসিলিটিজ দান করেছেন তাতে স্কুলের তুলনায় মাদ্রাসায় কয়েকগুণ বেশি ছাত্রছাত্রী থাকত যদি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরিপূর্ণ সুন্নাত থাকত। তা কিন্তু নেই। জেনারেল শিক্ষার পাশাপাশি সুন্নাতসহ হাক্কানী আলেম বানানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের যে প্রত্যাশা তা যে কোন কারণেই হোক না কেন, এখানে অপূরণ থেকে যাচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না পাওয়ায় কাঙ্খিত পরিমাণ ছাত্রছাত্রী বা অভিভাবক মাদ্রাসামুখি হচ্ছে না। অথচ রমজান মাস আমাদের আশা আকাঙ্খা পূরণের মাস। কিন্তু যাদের মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদের আশা পূরণ করবেন তাদেরকে তো অবশ্যই রমজানের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। সুন্নাত পরিপন্থী বদদীনি জীবনে অভ্যস্থ অথচ সমাজে আদর্শবান বলে পরিচিত লোকদের জীবনে রমজান কি কোন প্রভাব ফেলবে না? পোশাক আশাক চাল চলন ও আচার আচরণে তাদের হবে না কি কোন পরিবর্তন? তারা ঠিক না হলে তাদের মধ্যে রমজানের প্রভাব বিস্তারলাভ না করলে সহসাই এ সমাজ ঠিক হওয়ার আশা করা যায় না। আসুন, রমজানকে সামনে রেখে দোয়া করি ও ধৈর্য্যরে সাথে অপেক্ষা করি। দেখতে থাকি রমজানের শেষ অবধি। আমাদের বিশ্বাস, শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ রমজানের উসীলায় ঠিক হয়ে যাবেন। তারা ঠিক হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে মুর্খসুর্ক, অশিক্ষিতসহ এই সমাজ।

লেখক: প্রিন্সিপাল, এক্সিলেন্ট স্কুল এন্ড মাদ্রাসা

খতীব, দিউ বায়তুস সালাম জামে মসজিদ
ডিগ্রি কলেজ রোড, ফুলপুর, ময়মনসিংহ।

Share this post

PinIt
mamannan537

mamannan537

I'm M A Mannan. I'm a founder principal of Excellent School & Madrasah It's new name is Darul Ihsan Qasimia (Excellent) Madrasah. It's situated at Phulpur in Mymensingh. I'm also a journalist. I write in The Daily Tathyadhara, The Dainik Bangladesher Khabor and Bangladesh Pratidin.

scroll to top