২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শায়খে বালিয়া (রহ)’র ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী

Shaikhe-Balia.jpg

এম এ মান্নান
২০১৩ সাল। ১ ফেব্রুয়ারি। বালিয়া মাদরাসার ৯৪তম বড় সভার রাত। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ওলামার অভিভাবক শায়খে বালিয়া পীরে কামিল আলহাজ হজরত মাওলানা গিয়াছ উদ্দিন আহমদ পাঠান (রহ.) ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। তিনি ছিলেন খাঁটি আল্লাহওয়ালা এলমে ওহিতে সমৃদ্ধ আমলদার সাদা মনের এক আদর্শ পুরুষ। তার সমগ্র জীবনে রয়েছে জাতির জন্য মহান শিক্ষা। তাকে হারিয়ে ময়মনসিংহের আলেমরা এতিমসম। ‘মাওতুল আলিমে মাওতুল আলাম’ বাক্যটি এমন আলেমদের ক্ষেত্রেই মানায়। শায়খে বালিয়ার মধ্যে থাকা অলৌকিক শক্তিশালী চুম্বক মানুষকে আকর্ষণ করত, কাছে টানত। তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ ওলামাকে নিয়ে গঠিত ‘ইত্তেফাকুল উলামা’ সংগঠনের মজলিসে শূরার
সভাপতি। ধর্মবিরোধী বিভিন্ন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে শায়খে বালিয়া ছিলেন বজ্র কঠিন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। শায়খে বালিয়া (রহ.) বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ওলামার শুধু আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না বরং সর্বমহলের অভিভাবক ছিলেন। তিনি শুধু মসজিদ, মাদরাসা বা ইসলামী জলসার সভাপতি ছিলেন না বরং গ্রাম্য ও সামাজিক দরবারেরও সভাপতি রাখা হতো তাকে। মেম্বার-চেয়ারম্যান থেকে নিয়ে এমপি পর্যন্ত সবাই সমীহ করতেন এ কীর্তিমান পুরুষকে। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গেলে দেখা যায়, আজও শায়খে বালিয়ার অভাব অনুভব করে কেঁদে
ওঠেন ভক্তরা। সদা মানুষ তাকে ঘিরে রাখত। তিনি গণমানুষের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ভুল বুঝে অনেকে শায়েখে বালিয়ার দুর্নাম রটনা, গিবত- শেকায়েত এমনকি তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলেও তিনি কারও সঙ্গে মন্দ আচরণ করেননি। শায়খে বালিয়া রহ. কোনো দলের নয় বরং তিনি ছিলেন দেশের সম্পদস্বরূপ। তার স্মরণে বক্তব্য দিতে গিয়ে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে না এমন লোকের সংখ্যা কম। তিনি এতই কোমল চরিত্রের মানুষ ছিলেন যে, তার কাছে সবাই যেতে পারত, মনের কথা গুছিয়ে বলার সুযোগ পেত। তিনি ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। তার মুখে কোনো দিন পরনিন্দা, চোগলখুরি, গিবত শুনিনি। তিনি ধনী-গরিব, আলেম-মূর্খ, জেনারেল-শিক্ষিত কাউকেই অবজ্ঞা করতেন না। সবাইকে ভালোবাসতেন। তাই সবাই তার কাছে যেত। সবাই তাকে ভালবাসতো। যে তার সংস্পর্শে একবার গিয়েছে বা বসেছে, সেই বলাবলি করে ‘হুজুর আমাকে বেশি ভালোবাসতেন’। ফুলপুরের যে কোনো জনপদে বেরোলে কানে ভেসে আসে শায়েখ বালিয়ার প্রশংসা, যা শুনলে গর্ব অনুভব হয়। প্রিয় ওস্তাদ ও শায়েখ নূরুদ্দীন গহরপুরী (রহ.)এর
তত্ত্বাবধানে তিনি হাদিস, তাফসির ও ফিকহের উচ্চতর গবেষণার পর ১৯৬০ সালে পীরের মাদরাসা জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়ায় কর্মজীবনের সূচনা করেন। পরে মুরুব্বিদের আদেশ ও পীরের হুকুমে ১৯৬৮ সালে তিনি জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়ায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। পরবর্তী সময় ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মুহতামিম, শায়খুল হাদিস ও জীবনের শেষ দিকে বালিয়ার সদরুল মুহতামিম পদ অলংকৃত করেন তিনি। এছাড়া ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলের আনুমানিক পঞ্চাশোর্ধ্ব মাদরাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন শায়খে বালিয়া (রহ.)। জীবনে প্রচুর ছাত্র গঠনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক লাইনে ১১ জন মুরিদকে তিনি খেলাফত দেন। শায়খে বালিয়া (রহ.) দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এমনকি সুদূর লন্ডন পর্যন্ত ওয়াজ নসিহত ও দারসে বুখারির খেদমতের মাধ্যমে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শায়খে বালিয়া (রহ.) এর জন্ম ১১ মার্চ ১৯৩৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বালিয়া গ্রামে। তার বাবা ছিলেন মরহুম তৈয়্যব উদ্দিন পাঠান ও মা মরহুমা হাসান বানু বেগম। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তার
ছাত্রজীবনের অধিকাংশ সময় সিলেটে পীরে কামিল হজরত মাওলানা মরহুম নূরুদ্দীন গহরপুরী
(রহ.)এর তত্ত্বাবধানে কাটে। আর কর্মজীবন কেটেছে নিজ এলাকার জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম বালিয়ায়। আল্লাহপাক তাকে জান্নাতে আলা মাকাম দান করুন। ২০১৩ সালে ১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর আগ মুহূর্তে অসুস্থতা নিয়েই মধ্যরাতে বয়ান, খতমে বোখারি ও
মুনাজাত পরিচালনা করেন তিনি। এরপর জামিয়ার অফিসে কিছুক্ষণ বসেন। পরে মাদরাসা সংলগ্ন বাসায় যান। বাসায় যাওয়ার পরপরই অসুস্থতা বেড়ে গেলে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। সেখানে ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে কালেমা পড়তে পড়তে শায়খে বালিয়ার ইন্তেকাল হয়। বড়সভা মঞ্চের মাইকে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সভাস্থল ও গ্রামগঞ্জের লোকেরা এতিমের মতো কান্না শুরু করেন। কান্নার আওয়াজে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। ২ ফেব্রুয়ারি বিকালে ওই বড়সভার মুসল্লিরা স্মরণকালের বৃহৎ জানাজার মাধ্যমে শায়খে বালিয়াকে শেষ বিদায় জানান। আজ শায়খে বালিয়ার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। দিন যতই যাক না কেন শায়খে বালিয়া আমাদের অন্তরে আছেন চির অম্লান।আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে আ’লা মাক্বাম দান করুন।

Share this post

PinIt
mamannan537

mamannan537

I'm M A Mannan. I'm a founder principal of Excellent School & Madrasah It's new name is Darul Ihsan Qasimia (Excellent) Madrasah. It's situated at Phulpur in Mymensingh. I'm also a journalist. I write in The Daily Tathyadhara, The Dainik Bangladesher Khabor and Bangladesh Pratidin.

scroll to top