মাদরাসা শিক্ষা : অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ

Labib.jpg

লাবীব আব্দুল্লাহ
বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো দুই ধরনের৷ কওমী ও আলিয়া৷ কওমী মাদরাসা দেওবন্দি চিন্তাধারা লালন করে৷ আলিয়া মাদরাসার চিন্তাধারায় কী কী বিষয় তা আমার জানা নেই৷
১৭৮০ সাল থেকে আলিয়ার যাত্রা৷ আলিয়ার আগে এই উপমহাদেশে হাজার হাজার মাদরাসা ছিলো৷ ৮০ হাজার মকতব ছিলো৷ সেই সময়ের মাদরাসাপড়ুওয়ারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারতো৷ দীন শিখতো এমনকি দুনিয়াও৷ বিচারপতির দায়িত্ব পালন করতো মাদরাসাপড়ুওয়ারা৷ প্রশাসনের দায়িত্বও তারা পালন করতো৷ ইংরেজ বেনিয়ারা এসে মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে৷ লা খেরাজ ভূমি বাতিল করে দখল করে নেয়৷ ইসলামী শিক্ষা ধবংসের সকল আয়োজন তারা বাস্তবায়ন করে৷ সংগ্রামী আলেমদের অমানসিক নির্যাতন করে৷ বিপ্লবী আলেমদের আন্দামান দ্বীপে নির্বাসিত করে৷ হামলা মামলা হুলিয়া জারি করে সংগ্রামী আলেমদের বিরুদ্ধে৷ ইস্ট ইন্ডিয়া কোং শিক্ষাবান্ধব ছিলো না৷ মূর্খ মিশনারিরা ধর্মের নামে ভন্ডামি প্রচার করে সাম্রাজ্যবাদীদের পথ তৈয়ার করে দিতো৷ ত্রিত্ববাদের ধাঁ ধাঁয় ধোঁকা খেতো সাধারণ জনতা৷ ইংরেজরা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার দেখে উপমহাদেশের সম্পদ লুন্ঠন করতে আসে৷ লোভাতুর থাবায় বিধ্বস্ত হয় উপমহাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি৷ নীলকরের ইতিহাস জালেমদের ইতিহাস৷ মসলিন ধ্বংসের ইতিহাস কষ্টের ইতিকথা৷ কৃষকদের প্রতি অমানবিক জুলুম করে ইংরেজরা৷ জমিদারি প্রথায় কত কান্না ছিলো কৃষকদের৷ হিন্দু জমিদারদের জুলুমের গল্প দীর্ঘ৷ ইংরেজদের তল্পিবাহক মুসলিম নামের লোকগুলোও মুনাফিকি করেছে পলাশীর আমবাগানে৷ ১৭৫৭ সালের করুণ সেই ইতিহাস৷ মীর জাফর মীর সাদেকরা প্রকৃত কপট ছিলো৷ দেশপ্রেমীরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে ইংরেজ দুষ্টচক্র ও কপট মুসলিমদের হাতে৷ সেই ধূর্ত বেনিয়ারা এই দেশে কেরানি তৈয়ারের ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করে৷
চিন্তায় প্রতিবন্দী কিছু লোক তৈয়ার করতে প্রতিষ্ঠা করে স্কুল কলেজ৷ উদ্দেশ্য কেরানি উৎপাদন৷ কিছু ধান্ধাবাজ তৈয়ার করতে ইসলামী শিক্ষার নামে তৈয়ার করে আলিয়া মাদরাসা৷ প্রথম ২৭জন পরিচালক আবার সেই ইংরেজরাই৷
তারা শিক্ষায় বিভাজন তৈরি করে৷ মোল্লা তৈয়ারে আলিয়া৷ মিস্টার তৈয়ার করতে স্কুল কলেজ৷ স্যার সৈয়দ আহমদের জন্য আলীগড় মুসলিম কলেজ৷ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়৷
ডিভাইড অ্যান্ড রুলস নীতি বাস্তবায়ন করে৷ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে৷ হিন্দু মুসলিমের মাঝে বিরোধের বীজ রোপন করে সেই বেনিয়া গোষ্ঠীরাই৷ মুসলিমদের মুসলিমলীগ হিন্দুদের হিন্দুমহাসভা, কংগ্রেস৷ মোগল আমলের সেই হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির বসবাস আর সম্ভব হয়নি ইংরেজদের কূটচালের পর৷ ধর্মের নামে কলেজ৷ হিন্দুদের জন্য পৃথক মুসলমানদের জন্য আলাহেদা কলেজ৷
এই ইতিহাস কষ্টের৷ এই ইতিহাস নষ্টের৷
দুই
১৯০ বছর শাসন করে ইংরেজরা৷ পলাশী, বালাকোট, বাঁশেরকিল্লা, শামেলি সিপাহী বিপ্লব আরও কত অধ্যায় সংগ্রামের৷ হিংস এবং অহিংস কত আন্দোলন ইংরেজ হটাওয়ের জন্য৷ কালাপানি, আন্দামান সংগ্রামীদের আবাদ করার ইতিহাস৷ বহু বর্ণের, বহু জাতির, বহু সংস্কৃতির এই উপমহাদেশের সৌন্দর্য্য ক্ষত বিক্ষত করেছে ইংরেজরা৷ লুট করেছে আমাদের সম্পদ৷ স্বর্ণপ্রসবিনী এই উপমহাদেশকে তারা ভোগ করেছে৷ সেই বাহাদুর শাহ জাফরের কী করুণ ইতিহাস৷ মীর্জা গালিবের কত মর্মস্পর্শী দুঃখের কাব্য৷
চাঁদনির চকে গাছে গাছে সংগ্রামী আলেমদের ফাঁসি দিয়েছে৷ এ দেশের জনতাকে নির্যাতন করেছে৷ বৃটিশের সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেতো না তখন৷ এখন তাদের ভাগ্যের সূর্য উদিত হতে আমেরিকার প্রয়োজন পড়ে৷ তল্পিবাহক আমেরিকার৷ সংকোচিত তাদের রাজ্য৷ সেই রাজা রাণী আজ ফর শো৷ শোভা শুধু৷
বৃটিশ বেনিয়ারা উপমহাদেশের রাজভাষা ফার্সির পরিবর্তন করে ইংরেজি চালু করে৷ দিল্লির শত শত মাদরাসার ভবন গুঁড়িয়ে স্কুল কলেজ করে৷ লর্ড ম্যাকলের কেরানি তৈয়ারির ফর্মুলার বাস্তবায়ন হয় সফলভাবে৷ সংগ্রামী বিদ্রোহী উলামায়ে কেরাম বালাকোট শামেলির পর গ্রামে একটি মাদরাসা করেন৷ ভারতের উত্তর প্রদেশে৷ দারুল উলুম দেওবন্দ নামের মাদরাসা৷ যা ছিলো সংগ্রামী আলেমদের দূর্গ৷ আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ ও তাঁর শিক্ষাবিদ সাথীরা প্রতিষ্ঠা করেন সংগ্রামের সেই দূর্গ৷ যেখান থেকে জন্ম নেন সংগ্রামী আলেম শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান রহ.৷ ইংরেজবিরোধী অকোতভয় এক সংগ্রামী সাধক৷ যিনি কারাগারের লৌহ কপাটেও সংগ্রাম, মুক্তি ও স্বাধীনতার গান গেয়েছেন৷
মূলত: দেওবন্দ শুধু একটি প্রথাগত মাদরাসা নয়৷ এটি ইসলামকে বিজয়ী করার সকল প্রকার সংগ্রামের পাঠশালা৷
বিশ্বময় ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র৷ সত্যের পথে সংগ্রামের দূর্ভেদ্য দূর্গ৷ যদিও তা অনেকে জানেন না৷ জানলেই এটি একটি মাদরাসা বা প্রথাগত খানকা মনে করেন৷ কিন্তু দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠাতাদের চিন্তাধারা সে কথা বলে না৷ দর মাদরাসা খানকা দিদাম এটিও ঠিক কিন্তু বালাকোটের ধারাবাহিকতারই অংশ দারুল উলুম দেওবন্দ৷ চেতনায় বালাকোট৷ চেতনায় মক্কী জীবন নবীজীর৷ চেতনায় মাদানী জীবন রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের৷
তিন
উপমহাদেশে আলিয়া মাদরাসার জন্মদাতা ইংরেজরা৷ তবে এই আলিয়া মাদরাসা থেকে এক সময় বড় বড় মুহাদ্দিস তৈয়ার হয়েছে এটি অস্বীকার করা যাবে না৷ লেখক তৈয়ার হয়েছেন৷ দাঈ তৈয়ার হয়েছেন৷ কিন্তু সেই আলিয়া মাদরাসা ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়ে কলকাতা আলিয়া ও ঢাকা আলিয়া হয়ে যায়৷ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের সময় এক তত্ত্বের আলিয়াও দ্বিখন্ডিত হয়৷
আলিয়া মাদরাসার ইতিহাস নামের এক বইয়ে আলিয়ার বিস্তারিত অতীতের কথা আছে৷ আমরা যদি বর্তামান আলিয়া মাদরাসা দেখি তাহলে ইংরেজদের মতলবেব বাস্তাবায়ন দেখতে পাই৷ ভারতের আলিয়া মাদরাসায় এখন হিন্দু ছাত্র ছাত্রীরাও পড়ার সুযোগ পায়৷ মমতা সরকার অন্যের মমতা করেছে আলিয়া মাদরাসায়৷ নিয়োগ পায় হিন্দু শিক্ষকও৷ চরম ও পরম উদারতা এটি৷ কিন্তু হিন্দু ধর্ম শিক্ষার জন্য মুসলিম শিক্ষক নিয়োগ দিলে উদরাতার পূর্ণতা হতো৷ আসল অসম্প্রদায়িক চিন্তার বাস্তবায়ন হতো৷ কিন্তু তাহা হবে না কখনও৷ বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসার হাসি কান্নার ইতিহাস সবারই জানা৷ সেই আলিয়া ওল্ড স্কীম, নিউ স্কীম ভার্সনের কথা অনেকেই জানেন৷ নিউ স্কীমের হাই মাদরাসা একদিন রুপান্তরিত হয় হাই স্কুলে৷ ইবতেদায়ী মাদরাসার প্রতি চরম অবহেলার কথা কে না জানেন৷ অনেক সংগ্রাম করে দাখিল, আলিম, ফাযিল কামিলের সনদের মান হয়েছে অনার্স লেভেলের৷ কিন্তু আলিয়ার হাত পা কর্তন করা হয়েছে ধারালো চাকু দ্বারা৷ ক্ষত বিক্ষত৷ রক্তাক্ত দেহ আলিয়ার৷ কিছু শিক্ষক কর্মচারি চলছেন আলিয়া মাদরাসার বেতন ভাতায়৷ কিন্তু মাদরাসা থেকে তো হাফেয ও আলেম হবার কথা৷ আলেম কি হচ্ছেন কেউ? মুহাদ্দিস মুফাক্কির হবার কথা মাদরাসা থেকে৷ কিন্তু তা কি হচ্ছেন কেউ? বর্তমান সিলেবাস কি আলেম হবার উপযোগী? স্কুলের সিলেবাস তাহলে কী দোষ করলো৷ আলিয়ার দাখিল পর্যন্ত সিলেবাস তো স্কুলের ফটোকপি৷ কিছু ব্যতিক্রম আরবী কয়েকটি কিতাব৷
সরকারি মান নিতে গিয়ে ‘ফাঁন্দে পড়ে বগা কান্দে’ দশা আলিয়ার৷ উত্তরণের চিন্তা না আলিয়া মাদরাসা নামে থাকলেও বাস্তবে তা হবে স্কুল কলেজের ফটোকপি৷ হাই মাদরাসার পরিণাম৷ আল্লাহ না করুন। মাদরাসার ঐতিহ্য স্বকীয়তা যেন বজায় থাকে এই দাবি ও প্রত্যাশা৷
চার
দেশের স্কুল কলেজ ভার্সিটির স্কলাররা দেশ পরিচালনা করেন৷ আলিয়া মাদরাসা থেকে শিক্ষকতা, কাজিগিরির পাশাপাশি ইদানিং কেউ কেউ প্রশাসনেও আছেন৷ তবে হিকমতে আমলি ও কৌশলের কারণে সেইসব আলিয়াপড়ুওয়াদের পোষাকে পরিচয় পাওয়া দুষ্কর৷ তাছাড়া দাখিলের পর কলেজ ভায়া বিসিএস৷
কওমী মাদরাসার সনদ যেহেতু সরকারি স্বীকৃতি নেই তাই বিসিএস বা সরকারি কোনো পদে কেউ নেই তা তো সহজেই অনুমেয়৷ কওমীর জন্য লাখ লাখ মসজিদ এবং হাজার হাজার মাদরাসা আছে৷ প্রশাসনের কোনো দরজা তাদের জন্য খোলা নহে৷ যদিও এক সময় এই কওমী মাদরাস বা দীনি মাদরাসার স্কলাররাই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন৷ মুসলিম উম্মাহর খেলাফতের ইতিহাস সে কথাই বলে৷ তবে দেওবন্দ থেকে যে কওমীর শুরু সেটির ইতিহাস ভিন্ন৷ আমরা আগে ইংরেজবিরোধী ছিলাম৷ ভাবটা এখন মুসলিম প্রশাসনকেও ইংরেজ মনে করি। তাই দূরে দূরে বহু দূরে৷
ইংরেজ হটিয়ে পাকিস্থান করলেন উলামায়ে কেরাম কিন্তু সেই পাকিস্থানের কোনো প্রশাসনে নেই এই হযরত উলামায়ো কেরাম৷ কেন নেই তা এক রহস্য৷ দেশ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ৷ লাল সবুজের পতাকা চাঁদ সেতারার বদলে কিন্তু আমরা সেই ইংরেজ আমলের মতোই বিরোধী৷ মিম্বর ও মেহরাবই আমাদের প্রশাসন৷ কিন্তু সেটি এখন জাহেল আওয়াম টাকাওয়ালাদের দখলে৷ কিন্তু আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে আনন্দেই আছি৷ ইসলামের ইতিহাসে আলেমদের এতো দুর্দিন কোনো কালেই ছিলো না৷ এতো চিন্তার জড়তা কোনো কালেই ছিলো না৷ মাদরাসা শিক্ষাকে চার দেওয়ালের জন্য করার এই ষড়যন্ত্র কে করছে? মাদরাসা তো সব দেয়ালের জন্যই ছিলো৷ সব অঙ্গনের জন্যই৷ সব পদের জন্য৷ সকল প্রশাসনের স্তরের জন্য৷ কিন্তু কেন কী কারণে আমাদের হাজার বছরের মাদরাসা শিক্ষা চার দেয়ালে আবদ্ধ? তা ভাবতে হবে৷ ভাবতে হবে অতীত নিয়ে৷ পরিকল্পনা করতে হবে আগামীর৷ কেমন হবে একুশ শতকের মাদরাসা? কী হবে সিলেবাস? কী হবে এর রূপরেখা? একুশ শতকের চাহিদা ও দাবি পূরণে মাদরাসা শিক্ষা কী ভূমিকা রাখবে? তা নিয়েও ভাবতে হবে৷ ভাবনার জানালা উন্মুক্ত৷ এই ভাবনায় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ থাকবে৷ থাকবে তারুণ্যের স্বপ্ন৷ স্বপ্নের বাস্তবায়নে থাকবে কর্মসূচী৷বিশ্বসমস্যার সমাধান থাকবে এই ভাবনায়৷

Top