অস্তিত্ব সংকটে ফুলপুরের ঐতিহ্যবাহী খড়িয়া নদী

Phulpur-Kharia-River.jpg

এম এ মান্নান :
অস্তিত্ব সংকটে পরেছে ময়মনসিংহের ফুলপুরের ঐতিহ্যবাহী খড়িয়া নদী। এক সময়ের খর¯স্রোতা নদী খড়িয়া যেন হারিয়ে যাচ্ছে। নাব্যতা সংকটে মরিয়া ফসলের মাঠ ও বড় বড় পুকুরে পরিণত হচ্ছে খড়িয়া। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বের হয়ে আসা এই নদীটি ফুলপুরের ঐতিহ্যের একটি অংশ। উপজেলা সদরের আমুয়াকান্দা, ছনকান্দা ও রূপসী বাজার হয়ে নেত্রকোণার মগরা নদীতে মিশেছে খড়িয়া। খড়িয়া নদী বলতে এখন কোন নদী নয় বরং যেন এক সরু নালা। ফুলপুরের মানচিত্র নতুন করে তৈরি করা হলে ওই মানচিত্রে এক/দেড়শ গজ প্রশস্ত খড়িয়া নদী খুঁজে না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বড়জোর ৪/৫ হাত প্রশস্ত নালার মত কোন চিহ্ন থাকতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় ব্রিজগুলো দেখেও আন্দাজ হতে পারে যে, ওখানে বিশাল বড় নদী ছিল। তাছাড়া খড়িয়া নদী চিনার তেমন কোন আলামত এখন বিদ্যমান নেই। এখন খড়িয়া মানে ফসলের বিশাল মাঠ। খড়িয়া মানে বড় বড় বোরো ক্ষেত। খড়িয়া মানে মাছ চাষের বড় ঘের ও পুকুর। এক সময় খড়িয়ার বুক বেয়ে বহু দূর-দূরান্ত থেকে ফুলপুরে লঞ্চ স্টিমার ও পাল তোলা নৌকা আসা যাওয়া করতো। ধান-পাট বোঝাই বড় বড় মালবাহী নৌকা আসতো। খড়িয়া নদীকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ ও রাজধানী ঢাকাসহ জারিয়া, ঝাঞ্জাইল, পূর্বধলা ও নেত্রকোণার ব্যবসায়ীদের সাথে ফুলপুরের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। কাঁঠাল, নারকেল ও বিভিন্ন ধরনের মালামাল ভর্তি নৌকা আসতো। উল্লেখযোগ্য আমদানী রপ্তানী তখন নদীপথে হতো। এখন ওসব যেন রূপকথার গল্প।
উপজেলার কৃষ্টপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার (৮০) বলেন, তিনঘন্ডি উড়ায়া এই নদী দিয়া লঞ্চ চলতো। ঢাহাত্তে নাও আইতো মাল লইয়া। অহন এডি কই দেকবাইন? নদী নাই। নদী অহন ক্ষেত অইয়া গেছে। এই নদীতে প্রতি বছর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হতো। দু’পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতো হাজারো মানুষ। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দেরও আগে খড়িয়া নদীর তীরে জমিদারদের কাচারীসহ নানা স্থাপনা গড়ে ওঠেছিল। ব্রিটিশ আমলে উজান জোয়ার নামে প্রশাসনিক অঞ্চলের ভবন নির্মিত হয়েছিল ফুলপুরের ছনকান্দা বাজার সংলগ্ন খড়িয়া নদীর পাড়ে। সুসং দুর্গাপুর থেকে ব্রিটিশরা তখন পাল তোলা নৌকাযোগে ফুলপুরে আসতো। বিকাল হলে ছেলে বুড়ো সবাই খড়িয়া নদীর পাড়ে গিয়ে জমজমাট আড্ডায় বসতো। উপভোগ করতো নদীতে হঠাৎ জলজ প্রাণী শিশু ভেসে ওঠা ও বিচিত্র ধরনের সারি সারি পাল তোলা নৌকা যাতায়াতের অপরূপ দৃশ্য। ওইসব এখন শুধুই কল্পনা। কালের বিবর্তনে মরিয়া ক্ষেত হয়ে গেছে খর¯স্রোতা নদী খড়িয়া। খড়িয়া নদী এখন ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে। দুই তীরে যাদের জমি খড়িয়া অনেকটা তাদের হাতেই জিম্মি। এমনকি আগে যারা নদীর পাড়ের অংশ বিক্রি করে চলে গিয়েছিল পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় তাদের এখন দিন লাগছে। নতুন করে তাদের কেউ কেউ আবার এসে নদী দখলে নিচ্ছে। উপজেলার নগরপাড়া গ্রামের সম্রাট (২৫) বলেন, নদীর পাড়ে যাদের জমি নেই তারাও ধান লাগানোর ছলনায় নদী দখল করছে। ৫শ বর্গ মিটারের খড়িয়া নদী এখন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। দেখলে কান্না আসে- বললেন ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ রোডের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘খইরা নদী বেদহল অইয়া যাইতাছে। নদীর মধ্যে মাইনষে ঘর বানতাছে। ধান, পাট, আলু লাগাইতাছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসূন, খিরা, শসা, তরমুজ, লাউ, বেগুন কত কিছু ফলাইতাছে। এমুন কুনু ফসল নাই যা খইরা নদীতে অয় না।’ দখলকৃত খাস জমি কেউ কেউ বিক্রিও করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৃপ্তি কণা মন্ডল বলেন, নদী শুকিয়ে গেলে চাষাবাদে আমরা বারণ করি না। তবে বর্ষাকালে যদি কেউ পানি নিষ্কাষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, নদীর জমি কেউ বিক্রি করতে পারবে না এমনকি এটা পত্তন দেয়ার অধিকারও কারো নেই। উপজেলার নগরপাড়ার মো. শরীফ আকন্দ নদী খননের দাবী জানিয়ে বলেন, নদীটি খনন করা হলে সেচ সুবিধা বাড়তো এমনকি মাছসহ নদী অভ্যন্তরে যেসব সম্পদ থাকে তাও আমরা পেতাম। একই গ্রামের সম্রাট নামে এক যুবক বলেন, এই নদীতে ¯স্রোত আনতে হলে ব্রহ্মপুত্রকে সতেজ করাসহ ওই নদের মুখের বাঁধ খুলে দিতে হবে। তিনি বলেন, নিজের জমি এখানে না থাকলেও নদীর জমিতে ফসল ফলিয়ে নদী দখলে নিচ্ছে কেউ কেউ। আর এ সুযোগ সৃষ্টি হতো না যদি নদীতে পানি থাকতো। নদীতে প্রচুর পরিমাণে পলি পরে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিতেই প্লাবিত হয় দু’কূল। তখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খড়িয়া পাড়ের মানুষ। খড়িয়া নদীর হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে খননের কোন বিকল্প নেই। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ পৌর বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প নেই। একটা প্রস্তাবনা আসতেছে দেখা যাক কি হয়। তিনি আরও বলেন, নদীটি রক্ষায় বার বার প্রস্তাবনা পাঠানোর পরও কোন বরাদ্দ না আসায় আমরা কাজ করতে পারছি না। উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নদী দখলদারদের উচ্ছেদের দাবী জানিয়ে বলেন, শিগগিরই খড়িয়া নদী খনন না করা হলে মালিঝি নদী, কংশ ও ছোট ছোট শাখা নদীসহ সব নদীই বিলীন হয়ে যাবে। এতে নদী নির্ভর জনগোষ্ঠী ও জীব বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ সামগ্রিক অর্থনীতির উপর নেমে আসতে পারে বিপর্যয়। অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে নষ্ট হতে পারে ফসলি জমি।

Top