ময়মনসিংহে আগমন উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে মো. আব্দুল মান্নানের খোলা চিঠি

M-A-Mannan.jpg

আস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ময়মনসিংহে আপনাকে স্বাগতম। আপনি আমাদের এত কাছে আসছেন জেনে, কী যে খুশি হয়েছি! তা লিখে বুঝাতে পারব না। কিন্তু এত কাছে পেয়েও আপনার সাথে দুটি কথা বলতে পারব না, এ যেন আমার হৃদয়ে চেপে থাকা এক বড় যন্ত্রণা। আর তা হালকা করতেই আপনার কাছে এই খোলা চিঠি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি বাংলার এক সিংহ পুরুষের গর্বিত কন্যা। আপনার প্রশংসা লিখতে গেলে শেষ না। আল্লাহ আপনাকে আরো দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুক সে কামনা করি। নিজের পরিচয় দিয়ে মূল কথা শুরু করছি- আমার বড় পরিচয় এখন সাংবাদিক। সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আপনার দ্বারায় দেশের নানা উন্নয়নের কথা জাতিকে লিখে জানাচ্ছি। হাজারো উন্নয়নের কথা লিখলেও নিজের এলাকা এখনও (আংশিক) উন্নয়নবঞ্চিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পরিচয়টা আরেকটু ক্লিয়ার করি- আমি মো. আব্দুল মান্নান, পিতা মো. আব্দুল জাব্বার (জবর আলী) আর আমার মায়ের নাম হাসান বানু। জন্মসূত্রে আমার ঠিকানা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ৮নং নড়াইল ইউনিয়নের মধ্য নড়াইল গ্রাম হলেও লেখাপড়ার কারণে ১৯৮৫ সন থেকে বাড়ির বাইরে থাকি। পড়েছি বরিশালের ছারছীনা আলিয়া মাদরাসায়। সেখান থেকে ১৯৯৫ সনে কামিল পাস করে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছি ঢাকা দক্ষিণ যাত্রাবাড়ি আল্লামা মাহমুদুল হাসান সাহেবের মাদরাসায়। এছাড়া অন্যান্য জায়গাতেও করেছি। বিগত ১০ বছর যাবৎ আছি ফুলপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ রোডে একটি ভাড়া বাসায়। এখানে ‘এক্সিলেন্ট স্কুল এন্ড মাদরাসা’ নামে আমার একটি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এর পাশাপাশি দৈনিক তথ্যধারা ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় একজন উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমি নিউজ কাভার করে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে ফুলপুরে থাকতে থাকতে ও সাংবাদিক হিসেবে ফুলপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নানা দু:খ দুর্দশার সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরতে ধরতে এখন ফুলপুর ছাড়া অন্য কিছু যেন ভাবতে পারি না। অবসরে রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কোথায় কি অসুবিধা রয়েছে তা স্বচক্ষে অবলোকন করতে, পত্রিকায় প্রতিবেদন তুলে ধরতে। আর এভাবেই ফুলপুরের মাটি ও মানুষের সাথে আমার মহব্বতের যোগসূত্র। তাই ফুলপুরকে নিয়েই আপনার সাথে খোলামেলা দুয়েকটি কথা বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি জানেন, কোন রাজা-বাদশা বা দেশের হর্তা-কর্তা ব্যক্তি যখন কোথাও পা রাখেন, তখন নানা ধরনের দান-অনুদান বা হাদিয়া-তোহফা সেখানে লুটিয়ে পড়ে। পাল্টে যায় ওই এলাকার দৃশ্যপট। লাগে নানা উন্নয়নের ছোঁয়া। আশা করছি, আপনার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হবে না। আলহামদু লিল্লাহ, না শুকরিয়া করব না, অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু আমরা আরো আশাবাদী, আরো প্রত্যাশী। ইতোমধ্যে আমরা আনন্দের সাথে লক্ষ্য করছি, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছিলাম, ময়মনসিংহে এসে আপনি
৮২টি প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করবেন। অবশ্য পরে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা প্রশাসক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ বিভাগে সফরকালে ১০৩টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও ৯৩টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। ”শুনে খুশি হওয়ারই কথা। হয়েছিও কিন্তু এরপরও আমার মন খারাপ! কারণ, এতগুলো প্রকল্পের মধ্যে চোখে পড়েনি ফুলপুরের খরিয়া নদী খনন প্রকল্প, ফুলপুর-হালুয়াঘাট মহাসড়ক সংস্কার প্রকল্প, ফুলপুরে শিশু পার্ক প্রকল্প, ফুলপুর, সবজি সমৃদ্ধ ফুলপুরে হিমাগার প্রকল্প, হাসপাতাল উন্নয়ন প্রকল্প, ফুলপুর স্টেডিয়াম প্রকল্প, ফুলপুরে আলাদা বাসস্ট্যান্ড প্রকল্প, ফুলপুর উপজেলা মডেল মসজিদ প্রকল্প পৌরসভায় ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি প্রকল্প, ফুলপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাস্তা পাকাকরণসহ জরুরি বিদ্যুৎ পৌঁছানো প্রকল্প, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ প্রকল্পসহ এখনো অনেক অভাবেরই মিট-মীমাংসা হয়নি ফুলপুরে। অথচ প্রতিটি প্রকল্পই ফুলপুরবাসির জন্য অতিব জরুরি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের ফুলপুর-তারাকান্দা আসনের এমপি জননেতা শরীফ আহমেদসহ অন্যান্য নেতানেত্রী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেবুন নাহার শাম্মী ও উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়তো আপনি এসব সমস্যার কথা আগেই জেনেছেন। তারপরও আমি আমার আবেগটুকু আপনার সাথে শেয়ার করলাম।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমার জন্মভূমি হালুয়াঘাটের নড়াইল গ্রামের একটি সমস্যা আপনার কাছে না বললে মনে শান্তি পাব না। ইটাখলা-আলিশা বাজার পাকা রাস্তা সংলগ্ন পূর্ব নড়াইল দাখিল মাদরাসার পাশ দিয়ে উত্তর দিকে এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাকাকরণসহ নাকধরা নদীতে একটি ব্রিজের দাবি ওই এলাকার মানুষের হাজার বছরের। একটি ব্রিজের অভাবে যুগের পর যুগ ধরে অশিক্ষা-কুশিক্ষায় ভুগছে ওই এলাকার শত শত মানুষ। কৃষি নির্ভর ওই এলাকার মানুষ তাদের ধান-বন ও গরু-বাছুর নিয়ে পারাপারের সময় তিনজনেরও বেশি কৃষক ও রাখালকে প্রাণ দিতে হয়েছে ওই নদীতে। ভারত থেকে নেমে আসা নাকধরা নদী নড়াইলবাসির জন্য একটি মরণ ফাঁদ। এটি নড়াইলের কৃষকদের দু:খ। এই দু:খ দূর করতে হলে একটি ব্রিজের কোন বিকল্প নেই। এতে একটি ব্রিজ হলে প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে। বাড়বে নানা ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি কত জায়গায়ই তো ব্রিজ কালভার্ট করে দিলেন, হাওর, খাল-বিলে করে দিলেন কত স্কুল কিন্তু আমার গ্রামের নাকধরা নদীতে একটি ব্রিজ এমনকি নদীর উত্তর পাড়ের অসহায় শত শত শিশু-কিশোরদের জন্য একটি প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত আমরা আজও পেলাম না। ওই ব্রিজের জন্য বছরখানেক আগে হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া আসনের এমপি জুয়েল আরেং ভাইয়ের ডিও লেটারসহ সচিবালয়ে আমি দরখাস্ত জমা দিয়েছি। কিন্তু আমার সে দরখাস্ত আজও অালোর মুখ দেখেনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি যদি একটু দয়ার দৃষ্টি দিতেন, তাহলে ফুলপুরবাসির পাশাপাশি আমার জন্মভূমি নড়াইলের মানুষও একটু উপকৃত হতে পারতো। শেষ বয়সে হয়তো আমার বাবা ও তার বয়সীরাও ব্রিজের উপর দিয়ে গরুর গাড়ি ও ভ্যান গাড়ি দিয়ে ধান-বন বাড়ি আনার দৃশ্য এক নজর দেখে যেতে পারতেন!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সে আশা পূরণ হবে কি? নাকি বুকের ভিতরেই মরে যাবে? আমার এ চিঠি আপনার নজরে গেলে আশা করি তা শিগগিরই বাস্তবায়িত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ময়মনসিংহে এসে যেসব প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন ও শুভ উদ্বোধন করবেন তা পাঠকের অবগতির জন্য নিম্নে তুলে ধরা হলো-

২ নভেম্বর ২০১৮ শুক্রবার ময়মনসিংহ সফরে এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর পাড়ে নতুন বিভাগীয় শহরসহ ১০৩টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও ৯৩টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। ইতোমধ্যেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনযোগ্য এসব উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা চূড়ান্ত করেছে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। বিভাগীয় সদর দফতরের কার্যালয়সমূহ ছাড়াও বিভাগীয় স্টেডিয়াম, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খনন, ৩৬০ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।
ময়মনসিংহ বিভাগে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে এমন প্রকল্পের সংখ্যা ১০টি। এগুলো হলো- ময়মনসিংহ বিভাগের নতুন বিভাগীয় শহরের ভিত্তিপ্রস্তর, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়, বিভাগীয় সার্কিট হাউজ, বঙ্গন্ধু নভোথিয়েটার, বিভাগীয় স্টেডিয়াম, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, আরআরএফ-ময়মনসিংহ রেঞ্জ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খনন প্রকল্প, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতাল।
ময়মনসিংহ জেলায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে এমন প্রকল্প হচ্ছে ৩৩টি। ওগুলো হলো- ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, গৌরীপুর উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, সদর উপজেলার সিরতায় ডা. মুশফিকুর রহমান শুভ মেমোরিয়াল ইসলামিক মিশন হাসপাতাল, নান্দাইল উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ, হালুয়াঘাট উপজেলায় মডেল মসজিদ, ধোবাউড়া উপজেলায় মডেল মসজিদ ও জেলার হাইটেক পার্ক।
এছাড়া জামালপুরে ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। ওইগুলো হলো- বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদারগঞ্জ উপজেলায় শেখ হাসিনা স্পেশালাইজড জুট টেক্সটাইল মিল, মেলান্দহ উপজেলায় শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মাদারগঞ্জে শেখ রাসেল টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট ও জামালপুর জেলায় হাইটেক পার্ক।
আর ১৭টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে নেত্রকোনা জেলায়। সেগুলো হলো- শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া-বিরিশিরি-দুর্গাপুর জেলা মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়ক মান উন্নয়ন প্রকল্প, নেত্রকোনা-বিশিউড়া-ঈশ্বরগঞ্জ (ভায়া গৌরীপুর) সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, মোহনগঞ্জ উপজেলার হাইজদা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ ও জেলার চল্লিশায় হেনা ইসলাম কলেজ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি হয়তো গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন যে, ময়মনসিংহে এতগুলো ভিত্তি স্থাপন ও শুভ উদ্বোধনের মধ্যে আমাদের ফুলপুরে একটি প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত নেই এমনকি নেই আমার জন্মভূমি হালুয়াঘাট উপজেলার পূর্ব নড়াইল গ্রামে বহু কাঙ্খিত নাকধরা ব্রিজ উদ্বোধনও। বিষয়গুলোর প্রতি সদয় নজর দেয়ার জন্য আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি। আর আমার এসব আবেদনের বাইরেও আরো অনেক কিছু রয়ে গেছে সেগুলোও আশা করছি আপনি বুঝে-শুনে পূরণ করে দিবেন। ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাচ্ছি ও আপনার দোয়া কামনা করে শেষ করছি।ওয়াস্-সালাম। তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০১৮ খ্রি.

Top