হালুয়াঘাটে ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ দিবস পালিত

Telikhali1.jpg

মাজহারুল ইসলাম মিশু

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে যথাযোগ্য মর্যাদায় ঐতিহাসিক তেলিখালী যুদ্ধ দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে শুক্রবার দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন। সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিলো মহান শহীদদের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, ঐতিহাসিক তেলিখালী দিবসের তাৎপর্য শীর্ষক স্মৃতিচারণ সভা, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সঙ্গীতানুষ্ঠান ও প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী । উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক মোঃ খলিলুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন, হালুয়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আলমগীর পিপিএম, উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ খান, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কবিরুল ইসলাম বেগ প্রমূখ।
১৯৭১ সালের ৩ নভেম্বর ভারতীয় সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটের তেলিখালী ক্যাম্প পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে দখলমুক্ত করতে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা এক সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাঁচ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধে ১২৪ জন পাকিস্তানি সেনা ও তাদের শতাধিক সহযোগী রাজাকার আলবদরসহ ২৩৪ জনকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথবাহিনী। এতে শহীদ হন মিত্রবাহিনীর ২১ জন জওয়ান ও সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ময়মনসিংহ সীমান্তে এটি প্রথম বিজয়। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ময়মনসিংহের স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় হালুয়াঘাট সীমান্তের তেলিখালী ক্যাম্প দখল করে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। ভারত সীমান্ত থেকে চার কিলোমিটার ও হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ক্যাম্পে পাকিস্তানী সেনারা বিশাল অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভান্ডার গড়ে তোলে। এর পূর্বপাশের কড়ইতলী, দক্ষিণে মায়াখাসি ও পশ্চিমের রামচন্দ্রপুরা ক্যাম্পও দখলে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। সীমান্ত বরাবর শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে শক্তির দিক থেকে প্রধান ঘাটি ছিল তেলিখালী। ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি পুরো ইউনিট ছিল এই তেলিখালি ক্যাম্পে। পরিকল্পনা করা হয় তেলিখালী ক্যাম্প পাকিস্তানি সেনাদের দখল থেকে মুক্ত করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ২ নভেম্বর সকালে এ নিয়ে এক বৈঠকে যোগ দেন যৌথবাহিনীর কর্নেল রঘুবন সিংহ, ক্যাপ্টেন বালজিত সিংহ, ক্যাপ্টেন মালেক শাহ ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রয়াত আবুল হাশেমসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কোম্পানি কমান্ডারগণ। বৈঠকে যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। সেদিন ছিল ৩ নভেম্বর, ১৯৭১। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার গাছুয়াপাড়া টিলাসহ নির্ধারিত কয়েকটি জায়গা থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে রাত ১২টার পর তেলিখালী অভিমুখে যাত্রা করে এক ঘণ্টা হেঁটে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ছক অনুযায়ী তেলিখালীর দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্ব এই তিনদিকে অবস্থান নেয় ভারতের ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট ও পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। এর মধ্যে তেলিখালী ক্যাম্পের দক্ষিণে অবস্থান ছিল কর্নেল রঘুবন সিংহ, আবুল হাশেম কোম্পানি ও ইপিআর জওয়ানদের একটি দল। তিন দিকের তিনটি দলকে পেছনের দিকে যে কোন হামলা থেকে তারা করছিল কাটঅফ পার্টি। বিশেষ করে আক্রমণের পর কড়ইতলী, হালুয়াঘাট সদর, মায়াখাসি, বাঘাইতলী, রামচন্দ্রপুরা কিংবা নালিতাবাড়ি পথ দিয়ে আসা পাকিস্তানি সেনাদের যে কোনও ধরনের অভিযান আক্রমণ রুখে দিয়ে মোকাবিলার জন্য মূলত এসব কাটঅফ পার্টি অবস্থান নিয়েছিল। মার্চ করার সিগন্যাল পাওয়ার পর বুক সমান ধানক্ষেত মাড়িয়ে এবং ক্যাম্পের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা একটি পাহাড়ী ছড়া পার হয়ে তেলিখালী ক্যাম্পের দক্ষিণ পাশের পাহারাদার চৌকির কাছাকাছি চলে আসেন তারা। এ সময় টের পেয়ে যায় এক পাকিস্তানি পাহারাদার। কৌন হ্যায় বলা মাত্রই হাবিলদার মেসবাহর পাশে থাকা ইদ্রিসের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে ওই পাকিস্তানি পাহারাদার। এ সময় পূর্বপাশে থাকা অপর পাহারাদার দৌড়ে ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে ডাক চিৎকার শুরু করলে তুমুল যুদ্ধ বেধে যায়। তখন ভোর ৩টা। রমজানের সেহরির সময় চলছিল। ক্যাম্পের ভেতরের বাংকারগুলোতে আলো জ্বলছিল। যৌথবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি বর্ষণের জবাবে পাকিস্তানি সেনারাও ক্যাম্পের বাংকার থেকে পাল্টা গুলি চালায়। ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট আর মুক্তিযোদ্ধাদের তিন দিক থেকে একযোগে আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা বাংকারের ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে সকাল ৮টা পর্যন্ত। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের পাঠানো এসওএস বার্তায় কড়ইতলী ক্যাম্প থেকে মর্টার শেল আসতে থাকে তেলিখালী ক্যাম্পের চারপাশে। ভোর ৩টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টার এই যুদ্ধে একদিকে গুলি বর্ষণ, আরেকদিকে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে গ্রেনেড চার্জ করে যৌথবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা এই ক্যাম্পের সমুদয় পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার আলবদরদের খতম করতে সক্ষম হন। ক্যাম্পের ভেতর পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় রাজাকার আলবদর ছাড়াও অনেক নারীর লাশ পড়েছিল। সেদিন মিত্রবাহিনীরও অনেকে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তবে এই সংখ্যা ও যুদ্ধের সময় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তেলিখালী যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিফলক। ক্যাম্পের পেছনে সাত শহীদের গণকবর শনাক্ত করা হয়েছে। তাতে শ্বেতপাথরে লেখা সাত শহীদের নামফলক বসানো আছে। তালিকাভুক্ত সাত শহীদ হচ্ছেন, জামালপুরের সরিষাবাড়ির শওকত আলী, ময়মনসিংহের ফুলপুরের হযরত আলী, হালুয়াঘাটের আক্তার হোসেন, ময়মনসিংহ সদরের আলাউদ্দিন, শাহজাহান, রঞ্জিত গুপ্ত এবং সিপাহী ওয়াজিউল্লাহ।
Even if you didn’t understand the phrase, play it in your head a samedaypaper.org/ couple of times, like a broken record tonight we have a special guest , tonight we have a special guest , tonight we have a special guest

Top